
বাংলাদেশ ২০২২ অর্থবছরে ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানি ক্ষেত্র হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে, এবং বর্তমানে এই দেশ পঞ্চম স্থানে রয়েছে। এই তথ্য দেখে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ তার ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ বড় ভূমিকা পালন করেছে।
অদূর ভবিষ্যতে ভারতের অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ। এদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ তার নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে পারে বলে উদ্বিগ্ন ভারত। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। প্রাথমিক নৈরাশ্যবাদ, উদ্বাস্তু সমস্যা , ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো এবং পরিত্যক্ত কারখানার দ্বারা জর্জরিত বাংলাদেশে একসময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দুর্ভিক্ষ দেশের অর্থনীতিকে পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
যেমন ১৯৭৫ সালে ১৪% অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল।
সেসব এখন অতীত। একক ভাষা ও সংস্কৃতি, বৈচিত্র্যের গ্রহণযোগ্যতা, বেসরকারিকরণ অনুমোদন এবং বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার কারণেই বাংলাদেশের এই সমৃদ্ধি। একসময়ে পাটজাত পণ্যের উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ ক্রমে পোশাক তৈরিতে বিশ্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থানে উঠে এসেছে ।
বাংলাদেশ এখন প্রতি সেকেন্ড একটি করে টি-শার্ট তৈরি করে। পোশাকের আনুষঙ্গিক বোতাম এবং জিপার প্রস্তুতকারকদের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। গার্হস্থ্য শিল্প, কৃষি, ট্যানারি, ফার্মাসিউটিক্যালস, গ্লাস, প্লাস্টিক, সিমেন্ট এবং ইস্পাত খাতগুলি সরকার দ্বারা লালনপালন করা হয়, যার ফলে ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ।
মহামারীর ধাক্কা কীভাবে কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ
অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও মহামারীতে জর্জরিত হয়েছিল এবং লকডাউন চালু করতে বাধ্য হয়েছিল। এর জেরে যা ‘3Rs’-এর ( RMG, Rice and Remittance) উপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক অগ্রগতি বেশ খানিকটা ধাক্কা খেয়েছিল। মহামারী ব্যাপকভাবে ধাক্কা দিয়েছিল আরএমজি সেক্টরকে। কারণ বন্দরগুলি সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। যার জেরে সময়মতো ডেলিভারি দিতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এই শিল্পক্ষেত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
মার্চ ২০২০-এ শাটডাউনের পর থেকে, জুলাই এবং আগস্ট মাসে আগের দুই বছরের তুলনায় বেশি রপ্তানি হয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্র মহামারীর ধাক্কা সামলে উঠতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে যথেষ্ট বৈদেশিক রিজার্ভের পাশাপাশি রেমিট্যান্সের একটি স্থির প্রবাহ রয়েছে, যা অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছে। মহামারী চলাকালীন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বিশাল ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং সরকার প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটিকে সহায়তা করেছিল। এটি প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং স্থিতিশীল বিনিময় হার বাংলাদেশের দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি গত এক দশক ধরে রেখেছে।
বাংলাদেশের সামনে যা অপেক্ষা করে আছে:
মাঝে মাঝে কিছু চড়াই -উতরাই ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতি অব্যাহত । মহামারী সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে, কিন্তু অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই ধরনের বিনিয়োগ আনার জন্য, বাংলাদেশ শত শত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছে। যেখানে সমস্ত উত্পাদন ও রপ্তানি সুবিধা রয়েছে যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। কোরিয়া, জাপান, চীন এবং ভারত সবাই এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করেছে। এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে উন্নীত হলে বাংলাদেশ সম্ভবত একটি ট্রানজিশন শক অনুভব করবে। এটি তার মোট রপ্তানি লাভের ৮থেকে ১০ % হারাতে পারে। তবে শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উন্নত কর সংগ্রহ, নিম্ন কর সংগ্রহ থেকে-জিডিপি অনুপাত এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের মতো দেশীয় সংস্কারের মাধ্যমে, রূপান্তরটি মসৃণ করা যেতে পারে।
চীন ফ্যাক্টর:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের পাশাপাশি ভারত ও চীনের মধ্যে ক্রমাগত টানাপোড়েন থেকে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে। চীনের সাথে বাংলাদেশের নৈকট্য এবং সেইসাথে দুই দেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ইঙ্গিত দেয় যে, চীন আগামী বছরগুলিতে বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগী হয়ে উঠবে। চীন চায় বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগদান করুক, যা চীনের অর্থনীতিকে উপকৃত করবে। বাংলাদেশে চীনের আগ্রহের আরেকটি কারণ হল এই এলাকায় ভারতীয় প্রভাব সীমিত করা, যেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। ভারতের সমস্ত প্রতিবেশী (মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান) চীনা বিনিয়োগের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। চীন যদি বাংলাদেশকে তাদের ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারে তাহলে বঙ্গোপসাগরের উপর নিজেদের অধিকার কায়েম করতে সক্ষম হবে চীন, সেই সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখতে পারবে তারা । এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি বুদ্ধিমান অপারেটর হিসেবে কাজ করেছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের হাত মেলার সম্ভাবনা নিয়ে ভারত চিন্তিত ছিল। ভারত কি এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংশ হবে? তাদের ভিন্ন অর্থনীতি এবং তত্পরতার কারণে, ভারত এবং চীন আর্থিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে অক্ষম। ভারত যতক্ষণে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করবে ততক্ষণে চীনের একটি সেতু বা কয়েকটি মোটরওয়ে নির্মাণ করা শেষ হয়ে যাবে। তিস্তা নদী সমস্যা এবং সীমান্ত হত্যার মতো প্রাথমিক সমস্যাগুলির সমাধান করার পাশাপাশি ভারতকে অবশ্যই ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। বাংলাদেশের লোকেরা প্রায়শই মনে করে যে, ভারতের থেকে তারা ন্যায্য অংশ পায়নি কারণ তারা পরিসংখ্যান বুঝতে অক্ষম। ভারতকে অবশ্যই পূর্বের ঋণ পরিশোধ করতে হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে অংশীদার হতে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ এবং DRDO-এর মধ্যে সহযোগিতামূলক উদ্যোগে জাহাজ, রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যেতে পারে। এটি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদা পূরণ করবে (যা চীনা ব্যবসার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ), পাশাপাশি ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করবে এবং ভারত সরকারের ‘আত্ম-নির্ভর ভারত’ ফ্ল্যাগশিপকে প্রচার করবে। সামুদ্রিক ক্ষেত্রেও ভারত এবং বাংলাদেশের ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ভারতের অর্থনীতিতে একটি অনুকূল প্রভাব ফেলে কারণ এটি দেশের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্যগুলির মধ্যে একটি। বাংলাদেশ ভারতের একমাত্র প্রতিবেশী হয়ে উঠতে পারে যে ভারতকে কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন করতে পারে। কিন্তু ভারতকে মনে রাখতে হবে, ভূ-রাজনীতিতে বন্ধু-শত্রু বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো যায় না।
সূত্র : www.eurasiareview.com
কলমে : বেনেডিক্ট বি. জর্জ , টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো
অনুবাদে : সেবন্তী ভট্টাচার্য্য