
রাজধানী ঢাকায় দিন দিন কিউলেক্স মশার অত্যাচার বাড়ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় মশার ওষুধ দিয়েও মশার কামড় থেকে নগরবাসীতে রক্ষা করতে পারছে না দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।গত কয়েক মাস ধরে অনেক বেড়েছে মশার যন্ত্রণা। মশার অত্যাচারে বিপর্যস্ত নগরজীবন। এতে ডেঙ্গু আতঙ্কে রয়েছেন নগরবাসী। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীতে হঠাৎ করেই মশার উপদ্রব জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। মশার উপদ্রবে ডেঙ্গু আতঙ্কে রয়েছে নগরবাসী। কারণ ২০১৯ সালে দেশে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় লক্ষাধিক মানুষ। এতে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। সে সময় দুই সিটি মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে নানা সমালোচনার মুখে পড়ে।
রাজধানীর কথিত অভিজাত এলাকা উত্তরা, বনানী, বারিধারা, গুলশান ১ ও ২, মহাখালী, খিলগাঁও, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, সাততলা বস্তি রামপুরা,বাড্ডা, মধ্যবাড্ডা, বনশ্রী, টিটিপাড়া, মদিনাবাগ, মাদারটেক, আহমদবাগ, মুগদাপাড়া, গোড়ান, কুড়িল, গাবতলী, পাইকপাড়া, রূপনগর, মিরপুর-১, ২, ১০ ও ১২ নম্বর, কালশী, পল্লবী, কাফরুল, ক্যান্টনমেন্টের মাটিকাটা, ধানমন্ডি, মুহম্মদপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, পুরান ঢাকা, সদরঘাট, পল্টন, মতিঝিল, গোপীবাগ, মানিকনগর, কমলাপুর, মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, ওয়াপদা কলোনি, দনিয়া,জুরাইন, সায়েদাবাদ, শাহজাহানপুর, আজিমপুর, লালবাগ ও বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকা, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর এলাকাবাসীর মশা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই।
তাদের দাবি দিনে রাতে সব সময় মশার অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি বাড়িওলাদেরও দূষছেন তারা। তাদের মতে রাজধানীর বাড়িগুলোর সামনে পরিস্কার থাকলেও পেছনের অংশ থাকে অত্যান্ত নোংরা-আবর্জনায় ভড়া। বাড়িওলাদের উচিত সামনের অংশের মতো সব সময় পেছনের অংশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।তাহলে এভাবে মশার উপদ্রব বেশি হতো না।
এক্ষেত্রে বাড়িওলাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা। গোড়ানের বাসিন্দা রহিম খান বলেন, ঘরে-বাইরে কোথাও মশার অত্যাচারে থাকা যায় না। বিশেষ করে দিনের বেলায় মশা দেখলে সবাই আতঙ্কে থাকে। কারণ এসব মশার কামড়ে ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে।
মূলত এরজন্য ঢাকার বাড়িওলারা দায়ী থাকলে এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনেরও তেমন কোনো উদ্যোগও আমাদের চোখে পড়ছে না। অনেকেই অভিযোগের সুরে জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো কর্মীদের কখনো দেখেন নি। এমনি একজন কুড়িলের রহিম খান। তিনি বলেন, মশার যন্ত্রণায় সন্ধ্যার পরই দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে কয়েল জ্বালাতে হয়।
আগে দেখতাম, কর্পোরেশনের লোকজন আশপাশের নালায় মশার ওষুধ ছিটাত। এখন কাউকে দেখা যায় না। মগবাজার মীরবাগের বাসিন্দা নবীন হাসান বলেন, মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে আছি মহাবিপদে। ডেঙ্গু থেকে বাচতে সারাদিনই তাদেরকে মশারির মধ্যে রাখতে হয়। মশারির বাইরে বের করলেই মশা কামড়ায়। দিনেও কয়েল জ্বালিয়ে রাখছি। তবুও মশার কামড় থেকে নিস্তার মিলছে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্য্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। শুধুমাত্র সিটি করপোরেশনকে একা দোষ দিলে তো হবে না, এ বিষয়ে বাড়ি মালিকদেরও দোষ রয়েছে। তাই তাদেরও দায়িত্ব পালন করতে হবে।
এদিকে, এবারের শীত মৌসুমে মশার উপদ্রবে ঘরে-বাইরে কোথাও স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন নরবাসী। তারা বলছেন, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় না। আবার মাঝে মাঝে যে মশক নিধন স্প্রে করা হয় তাও কার্যকর নয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে নগরবাসী। একই সঙ্গে তাদের মনে ডেঙ্গু আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এ সময়ে কিউলেক্সসহ অন্যান্য মশার আক্রমণে ফাইলেরিয়াসিসসহ চিকুনগুনিয়া রোগেরও ঝুঁকি রয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন নগরবাসী। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেল্থ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যে জানা গেছে, হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গত এক মাসে ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ডিএসসিরি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, প্রতি শীতের সময়ে কিউলেক্স মশা কিছুটা বাড়ে। মশা নিধনে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে আমরা নিয়মিত তদারকি করছি। তিনি বলেন, আমরা যাচাই-বাছাই করে মশক নিধনের ওষুধ ব্যবহার করি। ওষুধ ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে তো মশা মরে না, কিছুটা সময় লাগে।
ডিএনসিরি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, শীতের সময় কিউলেক্স মশার উপদ্রব একটু বাড়ে। আমরা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম মনিটরিংয়ের পাশাপাশি ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষা করছি। পাশাপাশি বিভিন্ন খাল ও ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে, যাতে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস হয়। আমরা আশা করছি, শিগগিরই মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে আসবে। তিনি আরও বলেন, ওষুধের পরিমাণ বেশি হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। আমরা এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মশক নিধনের ওষুধ ব্যবহার করি।
ভিন্নবার্তা/এমএসআই