
সাবিহা ইসলাম: সকালে ভালো মন নিয়ে বাজারে গিয়ে স্বল্প আগের মানুষরা ঘরে ফেরেন মন খারাপ করে। কারণ একদিন আগে নিত্যপণ্যের দাম যা থাকে, পরের দিন তা বেড়ে যায়। প্রায় সব পন্যের ক্ষেত্রে এ অবস্থা। বিশেষ করে সবজির বাজার বাড়ছেই। চাল-চিনি, মাছ-গোশতের দাম বাড়ছে। ব্রয়লার মুরগির ও গরুর গোশতের দামও বাড়ছে। আর চাল নিয়ে মহাসঙ্কটের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের আগস্টের শুরুতে চাল আমদানি করে প্রয়োজনীয় মজুদ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন, ৬ আগস্ট আমদানির অনুমোদনও দিয়েছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট আমলারা দেশিয় সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশে সেই নির্দশনা বাস্তবায়ন করেনি। একারণে একদিকে দেশীয় বাজারের চালের মূল্য ব্যাপক বেড়েছে, অন্যদিকে এখন আন্তর্জাতিক বাজারের চালের মূল্য বেড়েছে। মাঝখানে পকেটভারি হয়েছে সিন্ডিকেট সদস্যদের। নিঃস্ব হচ্ছে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষগুলো। জানা গেছে, এ বছরের ১৮ মার্চ চালের মজুদ ছিল ৪ লাখ ৭৭ হাজার টন। গত বছর এ সময় যা ছিল ১৪ লাখ টনের বেশি। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরকারি খাদ্য ভান্ডারে ঘাটতি প্রায় ১০ লাখ টন চাল। আর তথ্যের উপর ভিত্তি করে কারসাজির হোতারা চুটিয়ে ব্যবসা করে চলছে। সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলে বাজার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত বলে মনে করছেন অভিজ্ঞরা। কিন্তু এ কাছে কাউতে তৎপর বলে মনে হচ্ছে না ভুক্তহভোগী ভোক্তাদের।
বাজারে অস্থিরতা
বাজারের খবর নিয়ে জানা গেছে, ক্রমেই চড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। রোজার আগে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ছে। বাড়ছে মাছ-মুরগি ও সবজির দামও। আলু-পেঁয়াজের দাম সেই যে বেড়েছে আর কমার কোনো আশা নেই। পাস্তুরিত দুধের দাম ইতোমধ্যে লিটারে ১০ টাকা বেড়েছে। রোজায় এসব পণ্যের দাম কততে গিয়ে দাঁড়ায় তাই নিয়ে সবাই এখন থেকেই চরম দুশ্চিন্তায়। মুরগির গোশতের দাম বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায়। লাল লেয়ার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। আর পাকিস্তানি কক মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৭০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগি ২৫ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। আর অন্যান্য মুরগির গোশত কেজিতে ২৫-৩০ টাকা বেড়েছে এক দিনের ব্যবধানে। পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকায়। আর আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়।
সরে জমিনে গিয়ে জানা গেছে, সবজির দাম এখন বেশ চড়া। গত সপ্তাহ থেকেই সবজির মূল্য বেশি। প্রতি কেজি করলা ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ থেকে ৭০, বরবটি ৭০ থেকে ৮০, শিম ৫০-৬০, পটোল ৬০, লতি ৭০, চিচিঙ্গা ৬০, সজনে ডাটা ২০০ থেকে ২২০, গাজর ২০-৩০, বেগুন ৪০-৪৫, টমেটো ২০-২৫ টাকা। প্রতি পিস লাউ আকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৩৫-৫০ টাকায়, বাঁধাকপি প্রতি পিস ২০, ফুলকপি প্রতি পিস ২০, মিষ্টি কুমড়ার কেজি ৩০, কাঁচামরিচ ৬০, পেঁপে প্রতি কেজি ৩০, খিরাই ৪০, শসা ৫০, মটরশুঁটি ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লেবুর হালি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকায়। ইন্ডিয়ান ও চায়না রসুন প্রতি কেজি ১২০ টাকা, দেশি রসুন ৭০-৮০, দেশি আদা ৬৫-৭০ এবং চায়না আদা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে।
তবে ডিমের দাম এখনো কমই আছে। এক ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। কোনো কোনো ডিম ১৪টি মিলছে এক শ’ টাকায়। হাঁসের ডিমের ডজন ১৫০ টাকা। দেশী মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। দাম বেড়ে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গরুর গোশত। আর খাসির গোশত মিলছে ৮৫০ টাকায়। বকরির গোশত পাওয়া যায় ৭০০-৭৫০ টাকায়। মাছের দাম বাজার ভেদে এবং মাছের মান ভেদে কমবেশিতে বিক্রি হচ্ছে। তবে গড়ে মাছের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে একাধিক ক্রেতা জানান। নুরে আলম নামের এক ক্রেতা বলেন, এখন ছোট সাইজের নদীর চিংড়ি কিনতে হচ্ছে ১০০০-১১০০ টাকা কেজি। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশী মাছের দামও গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে গড়ে ৫০ টাকা বেড়েছে। শুধু চাষের মাছই এখন নিম্ন আয়ের মানুষের একমাত্র ভরসা বলে নুরে আলম বলেন।
চালের মজুদ নিয়ে শঙ্কা
গত বছরের এই সময় যা চাল মজুদ ছিল এবার তার চাইতে প্রায় ১০ লাখ টান কম আছে। অর্থাৎ মাত্র ৫ লাখ টন চালও সরকারি ভান্ডারে মজুদ নেই। এ অবস্থায় একটি বড় ধরণের সঙ্কট লক্ষ্য করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছর আগস্ট মাসেই চাল আমদানিতে নেমে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। খাদ্য মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে নামে পাঁচ মাস পর। ফলে ঝুঁকি বেড়ে গেছে। কেউ কেউ বলছিলেন সরকার বোরোর উপর ভরসা করছে। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বোরোর ওপর ভরসা রাখা কঠিন। কারণ গোলায় তোলার আগমুর্হূতেও এ ধান তলিয়ে যেতে পারে হাওরের আগাম বন্যায়। হাওরে ধান নষ্ট হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চালের দামের ওপর। সেই ঝুঁকিপূর্ণ ধানেই ভরসা রাখতে হচ্ছে সরকারকে। তবে বোরোর ওপর ভরসা না রেখে উপায়ও নেই সরকারের সামনে। কারণ অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে খাদ্য অধিদপ্তর হাত বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে। নিজেরা চাল সংগ্রহের আগেই বেসরকারি খাতের আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যায়। আর সে কারণেই চুক্তিবদ্ধ সরবরাহকারীরা সরকারের গুদামে চাল সরবরাহ করতে পারছেন না। পর্যাপ্তসংখ্যক দরদাতার অভাবসহ নানা কারণে তিনটি দরপত্র বাতিল করে দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এ অবস্থায় দ্রুত কমছে সরকারি চালের মজুদ। গত ১৮ মার্চ চালের মজুদ ছিল ৪ লাখ ৭৭ হাজার টন। গত বছর এ সময় যা ছিল ১৪ লাখ টনের বেশি। সরকারি হিসাবেই খুচরা বাজারে মোটা সিদ্ধ চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকা দরে। আর সরু চালের দাম ৭০ টাকা। বোরো ধান ওঠার আগে চালের দাম কমার সম্ভাবনা দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রী গত ৬ আগস্ট যখন চাল আমদানির অনুমতি দেন, তখন বিশ্ববাজারে চালের দাম ছিল কম। দেশেও মোটা চালের দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। আমন ধান তখনো কাটা শেষ হয়নি। ওই সময়ে আমদানি শুরু করলে দেশে পর্যায়ক্রমে চাল আসত। ধারাবাহিকভাবে চালের দাম বাড়ত না। এখন বাংলাদেশে একসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই আমদানি শুরু হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে দ্রুত দাম বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী আমদানির নির্দেশ দেওয়ার পরও আমলারা কারসাজি করে চাল আমদানি শুরু করেনি। এ প্রসঙ্গে খাদ্য সচিব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওই সময় মাঠে আমন ছিল। আউশের বিষয়ও ছিল। ওই সময় চাল আমদানি করলে কৃষক ধানের ন্যায্য দাম পেত না। বিষয়গুলো বিবেচনা করেই চাল আমদানি করা হয়নি।’
ভিন্নবার্তা ডটকম/এন