
মোস্তাফিজুর রহমান তারা,রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা:বর্ষা এলে নদী ভাঙন বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক ধারণা। কিন্তু কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী উপজেলা রৌমারী ও রাজিবপুরে এখন বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে বারো মাসই যেন নদীর তাণ্ডব। শুকনো মৌসুমেও থামছে না ভাঙন; নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার।
নদীঘেরা জনপদ, ভাঙনের শঙ্কা চিরস্থায়ী
১৬টি নদ-নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই জনপদ কার্যত একটি নদীকূলীয় দ্বীপাঞ্চল। ভারতীয় সীমান্তের ১০৪৭ পিলার থেকে দক্ষিণে রাজিবপুর পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গড়ে ১০ কিলোমিটার প্রস্থজুড়ে বিস্তৃত অঞ্চলটি শতবর্ষ ধরে ভাঙনের সঙ্গে লড়ছে। সরকারি হিসাবে রৌমারীর আয়তন ৯৭ বর্গকিলোমিটার হলেও নদীভাঙনে তা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।
উত্তরের সাহেবের আলগা, সোনাপুর, ডিগ্রির চর, ঘুঘুমারী, পাখিউড়া, সুখেরবাতি, বলদমারা, বাইশপাড়া, ফলুয়ারচর, পালের চর, বাঘমারা, যাদুরচর নতুনগ্রাম, ধনারচর, কোমরভাঙ্গি, কোদালকাটি, খেয়ারচর—এমন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শুকনো মৌসুমেও চলছে ভাঙনের তাণ্ডব।
হাজারো পরিবার নিঃস্ব
যুগের পর যুগ নদীভাঙনে হাজার হাজার পরিবার হারিয়েছে ভিটেমাটি, জমিজমা ও জীবিকার অবলম্বন। অনেকেই বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে শহরের অলিগলিতে ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দুই উপজেলার প্রায় ৬ লাখ মানুষ ঘনবসতিপূর্ণ সংকুচিত এলাকায় বাস করছেন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে।
চরশৌলমারী হাটবাজার, পাখিউড়া, রৌমারী বাজার, কত্তিমারী, সায়দাবাদ, কোদালকাটি, খেয়ারচর এবং রাজিবপুর হাটবাজার—উপজেলা দুটির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রও এখন ভাঙনের হুমকিতে।
স্থানীয়দের মতে, নদীর প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, উজানের পানিপ্রবাহ ও চর জেগে ওঠার প্রক্রিয়া ভাঙনকে তীব্র করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থায়ী নদীশাসন পরিকল্পনা ছাড়া সাময়িক বাঁধ বা জিওব্যাগ ফেলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বরাদ্দ আছে, স্থায়ী সমাধান নেই
প্রতিবছর নদীশাসন ও ভাঙনরোধে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও অভিযোগ রয়েছে—নামমাত্র প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ অপচয় হচ্ছে। যথাযথ তদারকির অভাবে একটি প্রভাবশালী চক্র সুবিধা নিচ্ছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি—দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন ও কঠোর মনিটরিং ছাড়া এই জনপদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। নদীশাসনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
দেখার কেউ কি আছে?
নদীভাঙন এখানে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি সামাজিক ও মানবিক সংকট। প্রতিদিন ভাঙনের শব্দে আতঙ্কিত মানুষ অপেক্ষা করেন—কখন আবার মাটি ধসে পড়বে, কখন বিলীন হবে তাদের শেষ সম্বল।
নদী যদি জনপদ গ্রাস করতেই থাকে, তবে মানচিত্রে এই ভূখণ্ডের অস্তিত্ব টিকবে কতদিন—সেই উদ্বেগ এখন সর্বত্র।