
রাজধানীতে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে হলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে মাটি পরীক্ষার (সয়েল টেষ্ট) জমা দিয়ে ভবনের নকশা অনুমোদন নেয়ার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে মাটি পরীক্ষার ভুয়া প্রতিবেদন জমা দিয়ে ভবন তৈরির অনুমতি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে একাধিক বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে। এদিকে, রিপোর্টটি সঠিক কিনা তা যাচাই বাছাই না করেই অনুমোদন দিচ্ছে রাজউক। ফলে ভবন হেলে পড়া ও দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রায়ই।
অভিযোগ উঠেছে, সয়েল টেষ্ট নিয়ে ভবন মালিকরা প্রতারণা করছে। এক এলাকার জমিতে ভবন নির্মাণের অনুমতির জন্য অন্য এলাকার মাটি পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দিয়ে ভবন নির্মাণের নকশা পাস করানো হচ্ছে। আবার অনেক ফার্মে কোনো রেজিস্টার্ড ইঞ্জিনিয়ার বা মাটি বিশেষজ্ঞ নেই। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইঞ্জিনিয়ারের নামে সিল মেরে ভুয়া রিপোর্ট জমা দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীতে ভবন হেলে পড়া কিংবা দেয়াল ফেটে পড়ার অভিযোগ বাড়ছে। এসব ভবনের তদন্তের পর জানা গেছে, এর বেশির ভাগ ভবনের সয়েল টেস্টের রিপোট অবৈধ। অধিকাংশ এলাকার মাটির গুনগত মান বহুতল ভবন নির্মাণের উপযোগী নয়। কিছু এলাকায় ছয়তলার বেশি উচু ভবন নির্মাণ করলে যে কোন সময় উপড়ে বা হেলে পড়তে পারে। এ বিষয়ে রাজউকের সংশি¬ষ্ট বিভাগের দাবি এ পর্যন্ত যত ভবন ধসে পড়েছে এর একটিও রাজউক থেকে অনুমোদন নেয়া হয়নি। এগুলো বিল্ডিং কোড না মেনে নির্মিত হয়েছে। যার কারণে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, নকশায় সংশি¬ষ্ট প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর, নাম ও ঠিকানা থাকে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর তারা ছাড়পত্র দেন। যাতে উল্লেখ থাকে, যে কাজে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে তার জন্য এ স্থাপনাটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। এ ছাড়পত্র পাওয়ার পরই ওই ভবনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির সংযোগ দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। নকশা অনুমোদিত নয়, ছাড়পত্র নেই এমন ভবনগুলোতেও ইউটিলিটি সার্ভিসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। বিল্ডিং কোড না মেনে নির্মিত এসব ভবন ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
অপরদিকে, রাজধানীর অধিকাংশ ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে জলাশয়ে মাটি ভরাট করে। এতে যথাযথ পাইলিং না করার প্রায় ঘটছে দূর্ঘটনা। বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে প্রধান শর্ত হচ্ছে যথাযথ পাইলিং করা কিন্তু বিষয়টি সঠিত মতো মানা হচ্ছে না। সংশি¬ষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নগরীর ৩০ শতাংশ বাড়ি কাদা বা নরম মাটির ওপর ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। খাল ডোবা বা জলাশয় ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করতে হলে ভালোভাবে মাটি পরীক্ষা করতে হয়। তাছাড়া, এসব কম করে হলেও ৭০ থেকে ৯০ ফুট গভীর পর্যন্ত পাইলিং করে ভবন নির্মাণ করার বিধান রয়েছে। ভবন তৈরিতে শুধু রাজউকের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতেও অনেক বাড়িওয়ালা ‘সয়েল টেস্ট রিপোর্ট’ প্রধান করে। কিন্তু সেই টেষ্ট ভুয়া বলে ইতোমধ্যে প্রমানিত হয়েছে। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, যে খানে জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয় সেখানে মাটির নিচে স্পঞ্জের মতো পিট জমে থাকে। এসব জায়গা শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায় আবার বৃষ্টি পেলে ফুলে ওঠে। তখন এ রকম মাটির ওপর নির্মিত স্থাপনার উপরের দিকে উঠে আসতে পারে। এমন মাটিতে নির্মিত ভবনগুলো ভ‚মিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা খুবই বেশি। এছাড়া, রাজধানীতে কয়েকটি এলাকা ছাড়া বাকি সব এলাকার মাটি নিম্নমানের।
মিরপুর ১ নম্বর পল্লবী ও বাড্ডার অংশবিশেষ বোটানিক্যাল গার্ডেনের নিম্নাঞ্চল কল্যানপুর ও মোহাম্মদপুরের অংশবিশেষ, মেরাদিয়া, সাতারকুল কালাপানিসহ আরো কয়েকটি এলাকা বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য উপযোগী নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নগরীর ৩৫ শতাংশ মধুপুর ক্লে (লাল মাটি) ভবন নির্মাণের উপযোগী। বাকি ৬৫ শতাংশ মাটি বহুতল ভবনের ভার সহ্য করতে পারবে না। এসব জেনেও অনেক সময় রাজউক থেকে ভবন নির্মাণের অনুমদন দিয়ে দেয়া হচ্ছে। পরে এসব ভবনই এক সমসয় দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে।
ভিন্নবার্তা/এমএসআই