
যারা স্বচ্ছল তাদের কথা আলাদা। কিন্তু নাগরিকদের মধ্যে যারা দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ তারা উচ্চমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনবে কিভাবে? এক হাত না থাকা একজন পঙ্গু নারী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ভাইরাল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ওই নারী ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছেন, আমাদের সামর্থ নেই, এতো টাকা দিয়ে নিত্যপণ্য কেনার। তার আরও অনেক কথা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন- অসহনীয় মূল্যে পণ্য কেনার ক্ষমতা দেশের ১০ শতাংশ মানুষের থাকতে পারে কিন্তু বাকী ৯০ শতাংশ মানুষ প্রতিযোগিতামূলক মূল্য বৃদ্ধিতে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ।
বাজারের সব নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আয় বাড়েনি, উল্টো কমেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কারো কারো চাকরি চলে গেছে। নিম্ন আয়ের অনেক শ্রমিক কর্মহীন। এ অবস্থায় যেখানে পণ্যমূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকার কথা ছিল তা নেই, বাজারের প্রয়োজনীয় মনিটরিং থাকার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা যে যার মতো করে পণ্য মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে বার বারই দাবি করা হচ্ছে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু ঘাটতি না থাকার পরও কেনো মূল্য বাড়ছে, কোনো মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না জনগণের সেই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে গত এক বছরের নিত্যপ্রয়োজনীয় চার পণ্যেও মূল্য বেড়েছে ২৮ শতাংশ। প্রায় একই পরিস্থিতি অন্য পণ্যের ক্ষেত্রেও। অব্যাহত মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে হারতাল পালিত হয়েছে। সংসদেও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে এমন নিশ্চিয়তা পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রায় সব পণ্যের দামে এর প্রভাব পড়েছে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণেও সেবা ও পণ্যের দাম বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে- গত এক বছরের ব্যবধানে চালের দাম ১৮ দশমিক ২০ শতাংশ, সয়াবিন তেলের দাম সাড়ে ২১ শতাংশ, ডালের দাম ২৩ শতাংশ, আটার দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। সেই চাল-ডাল, আটা ও তেলের মতো নিত্যপণ্যেও দাম বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২৮ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। সেবার মধ্যে গণপরিবহণের ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। করোনার কারণে গত এক বছরে পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েছে। এতে বেড়ে গেছে জীবনযাত্রার ব্যয়। কিন্তু করোনার কারণে গত দুই বছরে মানুষের আয় বাড়েনি। বরং কমেছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে মানুষকে হাঁসফাঁস করতে হচ্ছে।
বাজারের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাড়তি ব্যয় মেটাতে অনেকেই নতুন সঞ্চয় করা কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকে আগের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। সম্প্রতি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের (সিপিএ) এক জরিপে দেখা গেছে. ২৬ শতাংশ মানুষ এখন সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। ঋণ করে খাদ্যের পেছনে ব্যয় করছেন ৩৪ শতাংশ পরিবার। আগে এ হার আরও বেশি ছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সঞ্চয় কমার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপিতে। জিডিপির আকার বাড়াতে হলে সঞ্চয়ও বাড়াতে হবে।
গত ২৮ মার্চ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাড়িয়ে বিএনপির হারুনুর রশীদ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সরকার টিসিবির মাধ্যমে সারাদেশে নিত্যপণ্য বিতরণের ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু সেখানে চাল, ডাল, খেজুর, তেল ও চিনি এসব পণ্য একই সঙ্গে নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু একজন গরীব মানুষের খেজুর বা ছোলা দরকার না থাকলেও তাকে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই কাজে সরকারের মাঠ প্রশাসন এতবেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে তারা স্বাভাবিক কার্যক্রমে মনোনিবেশ করতে পারছে না। বাজারে দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ নিয়ে জাতীয় সংসদও রীতিমতো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ২৮ মার্চ সোমবার অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, সরকারের উন্নয়ন চোখে দেখতে পাচ্ছি। একইসঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিও দেখতে পাচ্ছি। বাজারে গেলে মনে হয় না সরকার আছে। মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- দেশে যে উন্নয়ন হচ্ছে যারা দেখে না তাদের চোখ নষ্ট। তাদেরকে ডাক্তার দেখাতে হবে। না, প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি। উন্নয়ন হচ্ছে অনেক কিছুর কিন্তু আমরা আরো দেখতে পাচ্ছি দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির কারণে মানুষের হাহাকার অবস্থা। আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রী বলেছিলেন নিত্যপণ্য আমাদের অনেক আছে। অভাব নেই। তারপরও সমস্ত জিনিসপত্রের দাম অনেক বাড়ছে।’
লেখক: হাসান আল বান্না, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক