
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বড় জয়ের পর দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দীর্ঘ ১৯ বছর পর বাজেট দিতে যাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন।
এবারের বাজেটের আকার হতে যাচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মত। বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ওই বাজেট ঘোষণা করেন। এবার ৫৫তম বাজেট ঘোষণা করবেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং সর্বোচ্চ বাজেট।
এদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সবশেষ বাজেট পেশ করেছিল ২০০৬-০৭ অর্থবছরে। সেবার চার দলীয় জোট সরকারের বাজেট দিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
জুলাই অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ভিন্ন বাস্তবতায় এবার নির্বাচিত সরকার সংসদে বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব পাস হবে ৩০ জুন। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে নতুন অর্থবছর।
২০০৮-০৯ অর্থ বছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থ বছর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন আমলে বাজেট উপস্থাপন করেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও আ হ ম মুস্তফা কামাল।
এর মধ্যে সেনা-নিয়ন্ত্রিত ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন আমলে ২০০৭-০৮ এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন সে সময়কার অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। যা সংসদের বাইরে উপস্থাপন করা হয়। গত বছরও একইভাবে সংসদের বাইরে উপস্থাপন করা হয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের বাজেট উপস্থাপন করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন সরকারে মোট ১৪ জন অর্থমন্ত্রী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি (অর্থ উপদেষ্টা অথবা সামরিক আইন প্রশাসকসহ) এখন পর্যন্ত ৫৪টি বাজেট উপস্থাপন করেছেন।
এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১২ বার করে বাজেট উপস্থাপন করেন দুই প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং আবুল মাল আবদুল মুহিত।
এক নজরে বাংলাদেশের বাজেট পেশের ইতিহাস
১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই, প্রথম বাজেটটি দিয়েছিল মুজিবনগর সরকার। মাত্র তিন মাসের জন্য তৈরি সে বাজেটটি দিয়েছিলেন তখনকার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা এম মনসুর আলী। এরপর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩০ জুন বাজেট দেন প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ।
এরপর থেকে ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট চারটি বাজেট দিয়েছিলেন তিনি। এরপর ৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট দেন এ আর মল্লিক।
বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও দিয়েছিলেন তিনটি বাজেট। ১৯৭৬-৭৭, ৭৭-৭৮ ও ৭৮-৭৯ অর্থবছরের বাজেট। মির্জা নুরুল হুদা, ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরের একটি বাজেটই দিয়েছিলেন।
এম সাইফুর রহমান প্রথমবার বাজেট দেন, ১৯৮০-৮১ ও ৮১-৮২ অর্থবছরের। আবুল মাল আবদুল মুহিত এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮২-৮৩ ও ৮৩-৮৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিলেন। অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান ১৯৮৪-৮৫ থেকে টানা চারটি বাজেট পেশ করেন।
এরপর ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন আবদুল মুনিম, ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরের বাজেট ওয়াহিদুল হক ও আবদুল মুনিম পেশ করেন ১৯৯০-৯১ অর্থবছরের বাজেট।
এরশাদের পতনের পরে বিএনপির সরকারের অর্থমন্ত্রী হন এম সাইফুর রহমান, তিনি ১৯৯১-৯২ থেকে ৯৫-৯৬ টানা পাঁচ বাজেটটি পেশ করেছিলেন।
এরপর দীর্ঘ ২১ বছর বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগে এলে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া, ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০০১-০২ অর্থবছর পর্যন্ত টানা পাঁচ বার বাজেট দেন।
বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে আবারো অর্থমন্ত্রী হন এম সাইফুর রহমান। তিনি ২০০২-০৩ থেকে ২০০৬-০৭ অর্থবছর টানা পাঁচটি বাজেট দেন। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১২ বার বাজেট ঘোষণার রেকর্ড করেন তিনি।
২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দেন ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরের বাজেট। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দুই মেয়াদের টানা দশবার আবুল মাল আবদুল মুহিত দেন ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট। এতে সাইফুল রহমানের ১২ বার বাজেটে ঘোষণা রেকর্ডে ভাগ বসান তিনি।
আওয়ামী লীগ তৃতীয় বার ক্ষমতায় এলে অর্থমন্ত্রী বানানো হয় আ হ ম মুস্তফা কামালকে। তিনি ২০১৯-২০ থেকে ২৩-২৪ অর্থবছর মোট পাঁচটি বাজেট পেশ করেন। বিএনপিবিহীন ভোটে টানা চতুর্থ বার আওয়ামী লীগ ক্ষমতা এলে আবুল হাসান মাহমুদ আলী দেন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট।
তবে বাজেট পেশের দুই মাসের মধ্যে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। সবশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন দেন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট।