শিরোনাম

করোনা সংকট উত্তরণে কিছু প্রস্তাবনা

হাসান আল বান্না :

সারা পৃথিবী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আতঙ্কিত। বিশ্বের সকল জাতি রাষ্ট্রের সাথে প্রায় সব ধরনের যোগাযোগ ও বাণিজ্য বন্ধ। দরিদ্র থেকে সাম্রাজ্যবাদী সকল দেশই হিমসিম খাচ্ছে অদৃশ্য এই ভাইরাস মোকাবিলায়। শুরুতে বাংলাদেশে এই ভাইরাস কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও বর্তমানে তা বিস্তার করছে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের। সারাদেশ প্রায় লকডাউন। অফিস-আদালত, কল-কারখানা, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সহ সবকিছুই বন্ধ। সারা বাংলাদেশ আতঙ্কিত।

সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সামাজিক সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানও এই দুর্যোগে এগিয়ে এসেছে। মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছে। তারপরও সবমিলিয়ে অপ্রতুল। সরকার খুবই হিমসিম খাচ্ছে। মানুষও চরম আতঙ্কগ্রস্ত। যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে আর যদি এভাবে ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে তবে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। ক্রমাগত এই পরিস্থিতিতে দেশের ক্রান্তিলগ্নে ‘মানবাধিকার ৭১’ এর পক্ষ থেকে সংকট উত্তরণে কিছু প্রস্তাবনা পেশ করছি :

ক. জাতীয় ঐক্য :
১. দেশের এই সংকটকালীন সময়ে সরকার ও বিরোধী দল সহ সকল রাজনৈতিক দলের মাঝে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং সকল রাজনৈতিক দলের আন্তঃকমিটি গঠন করে নিয়মিত সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদার করে করোনা প্রতিরোধে জনকল্যাণমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া।
২. আভ্যন্তরীণ সকল রাজনৈতিক দল সমূহ করোনা প্রতিরোধে দেশব্যাপী ত্রাণ কার্যক্রম ও সেবামূলক মানবিক কর্মসূচী পরিচালনা করবে।
৩. সকল রাজনৈতিক দলের কোয়ালিশন কমিটির বৈঠক অনলাইনে অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে তাদের সারাদিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন এবং সন্ধ্যা ৭ টার পর থেকে সারা দিনের কার্যক্রম গণমাধ্যমে উপস্থাপন করবেন।
খ. লকডাউন :
আগামী একমাস সারাদেশ লকডাউনের আওতায় আনা। লকডাউন এর সময় সারাদেশের সব ধরনের সড়ক, রেল ও নৌ চলাচল এবং বিমান পরিসেবা বন্ধ থাকবে।
গ. ত্রাণ কার্যক্রম :
লকডাউনের পুরো সময় সারাদেশে খাদ্য, নিত্য প্রয়োজন পূরণে নিন্মোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা :

১. মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, অর্থ, পরিবহন, খাদ্য ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, এনজিও ব্যুরো সচিব, তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে জাতীয় ত্রাণ কমিটি গঠিত হবে। প্রতিদিন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এই কমিটির সমন্বয় সভা হবে। সেখান থেকে সারাদেশে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা ও মনিটরিং করা হবে।

২. সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, পুলিশ ও আনসারদের সমন্বয়ে সারাদেশে ইউনিয়ন /ওয়ার্ড ভিত্তিক ত্রাণ টিম গঠন করা। যেই টিমে স্থানীয় সুস্থ সবল জনপ্রতিনিধি, মানবিক ও নৈতিকতা সম্পন্ন যুব সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষকদের প্রতিনিধি সদস্য থাকবেন।

৩. দরিদ্র, অসহায় ও নিন্ম মধ্যবিত্ত এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে মধ্যেবিত্তদের তালিকা ভিত্তিক বাড়ি বাড়ি এক মাসের খাদ্য ও জরুরি কিছু ওষুধ সরবরাহ করা হবে।

৪. উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে পুলিশের সার্কেল এএসপি, তিন বাহিনীর উপজেলা প্রতিনিধি, উপজেলা প্রেসক্লাবের নির্বাচিত সাংবাদিক প্রতিনিধি, উপজেলা সরকারি স্কুল, কলেজ ও উপজেলা কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং উপজেলা মসজিদের খতিবের সমন্বয়ে ত্রাণ কার্যক্রমে মনিটরিং টিম থাকবে। যারা ইউনিয়ন ভিত্তিক ত্রাণ কার্যক্রমে তদারকি করবেন।

ঘ. চিকিৎসা কার্যক্রম
সারাদেশের সকল করোনা উপসর্গের চিকিৎসা কার্যক্রমকে বিনামূল্যে প্রদান এবং করোনা আক্রান্ত পরিবারের সদস্যদের সব ধরনের চিকিৎসা বিনামূল্যে প্রদান করা পাশাপাশি লকডাউন সময়কালীন অসহায় হতদরিদ্র ও শ্রমিক পরিবারের সব ধরনের রোগের ফ্রী চিকিৎসা প্রদান কর্মসূচী গ্রহণ।

১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, আইইডিসিআর মহাপরিচালক, পুলিশের দুইজন এআইজি প্রতিনিধি, তিনবাহিনীর একজন করে লে. জেনারেল পদমর্যাদার সদস্য এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের সাবেক প্রধানদের নিয়ে চিকিৎসা টিম গঠিত হবে। যারা সারাদেশের চিকিৎসা কার্যক্রমের মনিটরিং করবেন।

২. সারাদেশের সকল সরকারি কলেজ সমূহ এবং উপজেলা এমপিও ভূক্ত কলেজ সমূহকে অস্থায়ী কোয়ারান্টাইন সেন্টার তৈরি করা।

৩. স্থানীয় এমপির নেতৃত্বে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা হাসপাতালের প্রধান, ওসি, উপজেলা প্রধান চারটি রাজনৈতিক দল সভাপতিদের নিয়ে গঠিত হবে উপজেলা চিকিৎসা টিম।

৪. চিকিৎসাধীন ব্যক্তির খাবার, ওষুধ ও যাবতীয় প্রয়োজন উপজেলা চিকিৎসা টিম বহন করবেন। এবং কোয়ারেন্টাইনে থাকা রোগীর পরিবারেরও যাবতীয় খাদ্য ও ওষুধ উপজেলা চিকিৎসা টিম ব্যবস্থা করিবেন।

ঙ. নিরাপত্তা :
লকডাউন এর সময়ে সারাদেশ নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার আওতায় আনা হবে।

১. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশ প্রধান, ডিজিএফআই সহ সকল গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ, র‌্যাব এর মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক, কারা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, জাতীয় মিডিয়া সমূহের সম্পাদক পদমর্যাদার প্রতিনিধি এবং তিন বাহিনীর একজন করে লে. জেনারেল পদমর্যাদার প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে সংকটকালীন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। প্রতিদিন পুলিশ হেডকোয়ার্টারে এই কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হবে সারাদিন ব্যাপী। উক্ত সময়ে সারাদেশের নিরাপত্তা মনিটরিং করা হবে।

২. ট্রাফিক পুলিশ সার্বক্ষণিক রাস্তায় মোটরসাইকেল নিয়ে টইল দিবে। আর থানা পুলিশ আবাসিক এলাকায় টইলরত থাকবে। গোয়েন্দা সংস্থা সমূহ সাদা পোশাকে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা পালন করবেন।

৩. ত্রাণ লুটপাট ও বিতরণে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং অসহায়দের হসপিটালে ভর্তিও নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বে থাকবে।

৪. উপজেলা এসিল্যান্ডের নেতৃত্বে ওসি অপারেশন, ওসি তদন্ত, গোয়েন্দা সংস্থা সমূহের প্রতিনিধি, স্কাউট প্রধান, সাংবাদিক প্রতিনিধি নিয়ে নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হবে।

৫. গুজব, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক কাজ করবে নিরাপত্তা বাহিনী

৬. জেলা এসপি হবেন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাথে উপজেলা নিরাপত্তা কমিটির সমন্বয়ক।

চ. বাড়ি ভাড়া মওকুফ ও সেবা কাজে নিয়োজিতদের ক্ষতিপূরণ:

১. সারাদেশে আগামী তিন মাস বাড়ি ভাড়া দুই তৃতীয়াংশ মওকুফ করতে হবে। উক্ত তিনমাস বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া ট্যাক্স মুক্ত থাকবেন। তবে অন্যান্য আয়ে ট্যাক্স প্রদান করবেন।

২. ত্রাণ, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা টিম সংশ্লিষ্ট সবার সুরক্ষা ও প্রণোদনা এবং যে কোন ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্র বহন করবে।

ছ. খাদ্য উৎপাদন ও চাহিদা মেটানো :
১. সারাদেশে সকল আবাদি ও পতিত জমি কৃষি উৎপাদনের আওতায় আসবে। কৃষকদের বিনামূল্যে সার প্রধান, সেচ কাজে বিদ্যুৎ বিল মওকুফ, কৃষি আয়ে সকল প্রকার ট্যাক্স মুক্ত এবং কৃষি উৎপাদনে কৃষকদের বিনা সুদে এককালীন ঋণ প্রদান করতে হবে।

২. সংকটকালীন খাদ্য দ্রব্য আমদানিতে সকল প্রকার শুল্ক মুক্ত করা।

৩. উৎপাদিত ও আমদানি কৃত খাদ্য সরকার ত্রাণের জন্য প্রয়োজন মাফিক ন্যায্য দামে ক্রয় করবে এবং ত্রাণ কার্যক্রম বৃদ্ধি করবে।

জ. জাতীয় উৎপাদন ও রপ্তানি :
রপ্তানি মুখি পণ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখা ও গার্মেন্টস চালু রাখতে নিন্মোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া

১. উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও গার্মেন্ট কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় তাদের পিপিই হ্যান্ডস গ্লাভস ও মাস্কের ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের করতে হবে।

২. সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের পরিবারের খাদ্য সংস্থান ও প্রণোদনা প্রদান করতে হবে।

৩. ঢাকার বাইরে থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ডধারী শ্রমিক ও পরিবারের সদস্যদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পরিবহনে ইন্ডাস্ট্রি এলাকায় পৌঁছাতে হবে।

ঝ. প্রবাসীদের ত্রাণ :
বাংলাদেশের প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বিদেশে অবস্থানরত। যারা আমার দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তাদের এই সংকটময় মূহুর্তে রাষ্ট্রকে অবশ্যই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

১.পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রবাসী ও বৈদেশিক কল্যাণমন্ত্রী ও দুই মন্ত্রণালয়ের সচিব, উক্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিবদগণ এবং সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ টিম গঠন করতে হবে।

২. সকল দেশেই বাংলাদেশের দূতাবাসে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বাংলাদেশী সকল নাগরিকদের খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে হবে।

৩. ২৪ ঘণ্টা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও উপসচিবগণ রোস্টার ডিউটি পালন করবেন।

৪. প্রবাসীদের সহযোগিতায় ২৪ ঘণ্টা হটলাইন চালু থাকবে। যে কোন অভিযোগ ও অনুরোধ পাওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।

পরিশিষ্টি : সারাদেশের সকল রাজনৈতিক দল সমূহ শুধুমাত্র চিকিৎসা ও উদ্ধার কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নিবেন আর দলের পক্ষ থেকে বা দলীয় নেতা কর্মীর দানের অর্থ ও ত্রাণ ইউনিয়ন পর্যায়ে ত্রাণ কমিটির নিকট হস্তান্তর করবেন। বিচ্ছিন্নভাবে কারো ত্রাণ বিতরণ করার দরকার নেই। শিক্ষার্থীবৃন্দ হোম কোয়ারান্টাইনে থেকেই পড়াশোনা করবে। এছাড়া অনলাইন ভিত্তিক ও টেলিভিশন ক্লাসে মনোযোগী হবেন। শিক্ষকরা ভিডিও কলে ক্লাস নিতে পারবেন তবে প্রান্তিক এলাকায় সরকারের বিশেষ সহযোগিতা, নিরাপত্তা ও পরিবহনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি সাপ্তাহিক ফলোআপ করা যেতে পারে।
পরিশেষে, দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় সবাই স্রষ্টার নিকটে বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করি। ব্যক্তিগত ও জাতিগত অপরাধ, ভুল ত্রুটির জন্য আত্মসমালোচনা করি ও ক্ষমা প্রার্থনা করি।

লেখক : হাসান আল বান্না, কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
আরো পড়ুুন