
চরাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য দাবিতে—চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা মোস্তাফিজুর রহমান তারা, রৌমারী কুড়িগ্রাম থেকে।
বিস্তীর্ণ ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ধরলা ও তিস্তার বুকে জন্ম নেওয়া কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল—যেন এক বিশাল অনিশ্চয়তার নাম। নদী ভাঙনে প্রতিনিয়ত ভিটেমাটি, ফসলি জমি আর জীবিকার পথ হারিয়ে দিশেহারা মানুষগুলো বহু বছর ধরে অবহেলা আর বঞ্চনার এক চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছেন। চরবাসীর দীর্ঘদিনের সেই ন্যায্য দাবি—‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এখন নতুন করে গতি পেয়েছে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম জেলা চর বিষয়ক কমিটির আহবায়ক শফিকুল ইসলাম বেবুর নেতৃত্বে।
চরবাসীর চিরন্তন বেদনা: নদী ভাঙন থেমে নেই
প্রতি বর্ষায় চরাঞ্চলের মানুষকে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হয়—কখন জানি নদীর খামখেয়ালি স্রোত তাদের ঘরবাড়ি গিলে নেয়!
এ যেন চরবাসীর জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে—
রাতের আঁধারে ঘর ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া,
চর বদলের সাথে সাথে ভোটার তালিকা ও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চনা,
শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও কৃষিতে বৈষম্যের দগদগে ক্ষত।
নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অভিযোগ—দুর্যোগ প্রশমনের সময় কোনো সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যায় না। সরকারি দপ্তরগুলো নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, আর স্থানীয় মানুষের আর্তনাদ থেকে যায় উপেক্ষিত।
সাম্প্রতিক সময়ে চরবাসীর দাবিকে নতুনভাবে সক্রিয় করেছেন কুড়িগ্রাম জেলা চর বিষয়ক কমিটির আহবায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু। তিনি মনে করেন, দেশের প্রায় দুই কোটিরও বেশি চরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন, পুনর্বাসন, অবকাঠামো, কৃষি ও নিরাপত্তার জন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয় সময়ের দাবি।
“চরাঞ্চলের মানুষের সমস্যার আলাদা স্বরূপ রয়েছে। তাদের জন্য আলাদা বরাদ্দ, বিশেষ পরিকল্পনা ও টেকসই অবকাঠামো নিশ্চিত করতেই চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রয়োজন।”
কেন প্রয়োজন চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়?
শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন,
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, চরাঞ্চলের জন্য বিশেষ মন্ত্রণালয় হলে—
✔ স্থায়ী নদী ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে
✔ চর ভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন, ফলন বৃদ্ধি ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে
✔ চরবাসীর পুনর্বাসন, গৃহনির্মাণ ও জমির মালিকানা স্পষ্ট করা যাবে
✔ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে
✔ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা হবে দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট
চরাঞ্চলের মানুষ মনে করেন, নদীর গতি-প্রকৃতি, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও বার্ষিক দুর্যোগের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় তাদের জীবন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের উন্নয়নও হতে হবে আলাদা পরিকল্পনায়।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু—অবহেলা আর অসমতা
বছরের পর বছর চরবাসীর অভিযোগ—
বরাদ্দ আসে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে পৌঁছায় না,
উন্নয়ন প্রকল্প টিকতে না টিকতেই নদীতে বিলীন হয়,
সরকারি সহায়তা পেতে হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়,
জরুরি পরিস্থিতিতে নৌযান, সেতু, ঘাট, রাস্তা—কিছুই না থাকায় জীবন চলে অনিশ্চয়তার ওপর।
এই দীর্ঘ বঞ্চনার কারণেই শফিকুল ইসলাম বেবু ঘোষণা দিয়েছেন ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচির। তিনি বলেন,
“চরবাসীর অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে এই আন্দোলন থামবে না। চরাঞ্চল আর অবহেলার প্রদেশ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের অংশ হতে হবে।”
চরাঞ্চলের মানুষও আশাবাদী
চরের মানুষের মুখে নতুন আশার সুর। তারা বলছেন—
“যদি চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় হয়, তবে আমাদের বাঁচার পথ খুলবে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ বদলাবে। আমরা আর ভাসমান মানুষ হতে চাই না
চরাঞ্চল শুধু ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়, এটি একটি মানবিক সংকটের নাম। দেশের লাখো মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত এই জনপদকে অবহেলার অন্ধকার থেকে বের করে আনতে হলে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতেই হবে। আর সেই পথের প্রথম ধাপ—চর বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা।
শফিকুল ইসলাম বেবুর নেতৃত্বে এই দাবি এখন চরাঞ্চলের হাজারো মানুষের কণ্ঠস্বর।
তাদের একটাই উচ্চারণ—
“চর বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, মানুষ বাঁচলে দেশ বাঁচবে।”