
বিশেষ প্রতিবেদক : করোনা মহামারির মধ্যে আগামী অর্থবছরের জন্য বিরাট প্রত্যাশার বাজেট দিতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এবারের বাজেটের আকার হতে পারে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। যা বিদায়ী অর্থ বছরের চেয়ে প্রায় পাঁচশ কোটি টাকা বেশি। বাজেটে মশক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, জলাবদ্ধাতা এবং পরিচ্ছন্নতা খাতে বিশেষ গুরত্ব দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। এছাড়াও বস্তি উন্নয়ন, খালের সীমানা নির্ধারণ, নতুন ১৮ ওয়ার্ডেও উন্নয়ন, নিরাপদ সড়ক, অগ্নি নিরাপত্তা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ সহ নাগরিক সেবায় আধুনিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রূপরেখা থাকবে এবারের বাজেটে।
২০২০-২০২১ অর্থবছরের সাড়ে হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছিল ডিএনসিসি। সংস্থাটির জনসংযোগ শাখা থেকে জানানো হয়েছে আগামী ১০ জুলাই ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন।
২০২১-২০২২ বাজেট কেমন হবে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, এবারের বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় বাড়নো হবে। যেখানে অটোমেশনই বড় চ্যালেঞ্জ। এর উপর জোর দিতে চাই। কারণ কপোরেশনের যে কোন উন্নয়নমূলক কাজের জন্য রাজস্ব জরুরি। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের আমাদের কর্মকতাদের বাড়ি বাড়ি যেতে হয়। এবার সেই জায়গা থেকে কীভাবে আধুনিকভাবে ক্যালকুলেশন করা যায় সেই চেষ্টা করা হবে। এমনকি রাজউকের চেয়ারম্যানকেও বলেছি বিল্ডিং ড্রয়িয়ের এ্যাপরুভালগুলো আমাদের অনলাইনে দিয়ে দেওয়ার জন্য।
তিনি বলেন, রাজধানীর বস্তিগুলোতে ঘনঘন অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় ফায়ার হাইড্রেন্ট করে দিব। এজন্য আমি একটা বাজেট রেখেছি। আমরা প্রত্যেকটি বস্তির বিভিন্ন অংশে রাস্তায় এটা বসিয়ে দেব। এছাড়াও বাজেটে মশা, শিক্ষা, জলাবদ্ধতা পরিচ্ছন্নতার উপর মূল ফোকাস থাকবে বলে জানান মেয়র আতিক।
ডিএনসিসির রাজস্ব বিভাগ জানায়, ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব খাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। যা বিদায়ী অর্থবছরের ছিল ৯শ কোটি টাকা। এ বছর রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭০ ভাগ। এবার নতুন ওয়ার্ডের বাণিজ্যিক ভবনগুলো ট্যাক্সের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা থাকতে পারে বাজেটে। কারণ ডিএনসিসি এলাকায় হোল্ডিং ট্যাক্স (গৃহকর) পরিশোধ করে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ভবন মালিক। এসব ভবন মালিকদের থেকে সংস্থাটির প্রতি বছর গড়ে আয় হয় প্রায় সাড়ে চারশ কোটি টাকা। বাকি টাকা বকেয়া পড়ে থাকে। এসব বকেয়া টাকার মধ্যে বাড়ির মালিকদের চেয়ে অধিকাংশই বিভিন্ন সরকারি সংস্থার। এ বছরও প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি সরকারি এবং আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই পাওয়া রয়েছে শত কোটি টাকা।
ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো: আবদুল হামিদ মিয়া বলেন, প্রতি বছর বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চেষ্টা করি ৬০-৭০ শতাংশ ট্যাক্সের অর্থ আদায় করতে। বাকি ৩০-৪০ শতাংশ পরের বছর আদায় করার লক্ষ্য থাকে। কিন্তু ডিএনসিসির শত শত কোটি টাকার হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া পড়ে আছে। এভাবে তো একটা প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। তিনি বলেন, ডিএনসিসি এলাকায় সরকারি যেসকল মন্ত্রণালয় এবং সংস্থা রয়েছে তাদের অধিকাংশের ট্যাক্স ফি বকেয়া। বিশেষ করে রাজউক, হাউজিং, ডেসকো, ওয়াসা সহ অনেক প্রতিষ্ঠান। এদের কাছ থেকেই তো বকেয়া আছে শতকোটি টাকার উপরে। আবার নতুন করে যেসব ভবন এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তারাও হোল্ডিং ট্যাক্সের আওতাভুক্ত হয়নি।
ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাকলে পিছিয়ে পরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কিছুটা নাগরিক সেবার আওতায় আনতে এবারের বাজেটে অনলাইনে শিক্ষা চালু করা হবে। স্কুল বন্ধ থাকা অবস্থায় যারা সন্তানদের প্রাইভেট শিক্ষক দিয়ে পড়াতে পারছেন না তাদের জন্য থাকবে এই ব্যবস্থা। এখানে সিটি কপোরেশনের নিজস্ব খরচে বিভিন্ন সাবজেক্ট ভিত্তিক শিক্ষকদের অনলাইনে নিয়ে আসা হবে। শিক্ষার্থীরা সরাসরি অনলাইনে যুক্ত হয়ে ক্লাস করতে পারবে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের কাছে এ শিক্ষা সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে। এছাড়াও করোনাকালে বেকারত্ব দূর করতে ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
মশক নিধনে ২০২০-২১ অর্থবছরে ডিএনসিসি বাজেট রাখা হয়েছিলো ৭৭ কোটি টাকা। বরাদ্দ বাড়িয়ে এবার এই খাতে ৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে ডিএনসিসি। জানা গেছে, মশক নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি ওয়ার্ডেও কাউন্সিলদের টেনিং দেওয়া হবে। লার্ভিসাইট ও এডালটিসাইকে আলাদাভাবে ভাগ করে কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল-বিকাল ৪ ঘণ্টা করে ওষুধ ছিটানো পাশাপাশি বিশেষ চিরুনি অভিযানও অব্যাহত থাকবে। বাড়ানো হবে যান, যন্ত্রপাতি ও কর্মী বাহিনী। এছাড়াও একটি অঞ্চলকে মশার আউট সোসিংয়ের জন্য আলাদা করে দেওয়া হবে।
টেন্ডারের মাধ্যমে মশক নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রাইভেট কোম্পানিকে এসব অঞ্চলের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হবে। যেখানে ঔষুধ, ছিটানোর লোক এবং টেকনেশিয়ার জোগান দেবে কোম্পানিগুলো। এখানে কপোরেশনের পক্ষ থেকে এমটোমলজিস্টদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হবে। এই কাজে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা ৭ কোটি করে টাকা বারাদ্দ রাখা হবে।
বাজেটে মশক নিয়ন্ত্রণের কি ধরনের পকিল্পনা থাকা উচিত জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. কবিরুল বাশার বলেন, ইনভারমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট, বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল, ক্যামিকেল ও পাবলিক এ্যাওয়ারনেস মশক নিধন প্রক্রিয়াকে এ চারটি ভাগে ভাগ করে কাজ করলে সুফল মিলবে। এক্ষেত্রে উত্তরার কোন একটি অঞ্চলকে পাইলট অঞ্চল হিসেবে দিয়ে দেখা যেতে পারে। এছাড়াও বাড়িতে বাড়িতে সচেতনমূলক স্টীকার লাগালে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। তিনি বলেন, বাজেট কীটনাশক কেনার চেয়ে পরিচ্ছন্নতা ও পাবলিক এ্যাওয়ারনেসে বেশি বরাদ্দ রাখা উচিত। কারণ কীটনাশকের টাকা মিসইউজ বেশি হয়।
এবার সবুজ, পরিচ্ছন্ন, স্মার্ট ও মানবিক ঢাকা গড়ে তুলতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন উত্তর সিটি। এই খাতকে গুরত্ব দিয়ে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বেশি কিছু প্রচারণামূলক প্যাকেজ কর্মসূচি রাখা হয়েছে পরিকল্পনায়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-মশার বংশবিস্তার রোধে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা আবর্জনা ফেলুন, পথচারীরা রাস্তা ও ফুটপাত পরিষ্কার রাখার জন্য ওয়েস্ট ভিন ব্যবহার করুন, বাড়ি-ঘর রং করুন’ এবং সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলুন। এছাড়াও নগরবাসীর জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে ‘ঢাকা অ্যাপস’ চালু করা হবে। প্রথমবারের মতো উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মচারির জন্য পেনশন চালু করা হবে।
গেলো বাজেটে খাল উন্নয়নে ৫২ কোটি টাকা খরচ করেছে উত্তর সিটি। এবারও খাল উদ্ধারে বৃহৎ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খালের সীমানা নির্ধারণ ও পিলার সবানোর জন্য আলাদা মোটা অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হবে। এ কারণেই নিজস্ব আয়কে বাড়ানোর জন্য অটোমেশনের উপর বেশি জোর দিচ্ছেন মেয়র আতিক। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় কপোরেশনরে অগ্রাধিকার খাতগুলোতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করবে ডিএনসিসি। নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা চালু রাখা হবে। এছাড়াও হ্যান্ড স্যানেটাইজার ও মাস্কের জন্য মেয়রের নিজস্ব খরচ থেকে বিশেষ বরাদ্দ থাকবে।
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, এবারের বাজেটে ডিএনসিসিভুক্ত নতুন ১৮টি ওয়ার্ডকে নাগরিক সুবিধার আওতায় আনতে থাকছে বৃহৎ পরিকল্পনা। এসব এলাকার বিদ্যমান সমস্যার সমাধান ও উন্নয়নে ২ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এবং অন্যান্য সেবা সংস্থাগুলোর ১০০ বছরের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে ওই নতুন ওয়ার্ড প্রকল্পের নকশা করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন চিন্তা ‘ল্যান্ড ব্যাংক’ ওয়ার্ড কমপ্লেক্র, ‘ইউটিলিটি ডাক্ট’ নির্মাণ করা হবে।
মেয়রের ঐচ্ছিক তহবিলে এবার ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে। গেল অর্থবছরে এ খাতে মেয়র খরচ করেছেন ৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এবার ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরে এই খাতে ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। নতুন অর্থবছরে আতিথেয়তা ও উৎসব খাতে সাড়ে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গেল অর্থবছরে এ খাতে সংস্থাটি খরচ করেছে সাড়ে ৯ কোটি টাকা।
বস্তি উন্নয়নের উপর বেশি জোর জেয়া হবে এবারের বাজেটে। ডিএনসিসির আওতাধীন বস্তিগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফায়ার হাইড্রেন্ট (পানি সংরক্ষণাগারের সঙ্গে সংযুক্ত বিশেষ পানিকল) স্থাপন করা হবে। সড়কের পাশে থাকা এই ফায়ার হাইড্রেন্টগুলো থেকে নল যুক্ত করে আগুন নেভানোর কাজ করা যায়। এই হাইড্রেন্ট ব্যবহারের বিষয়ে বস্তির বাসিন্দাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যাতে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস আসতে কিছুটা সময় লাগলেও। বস্তিবাসী ট্রেইনড হয় ভলান্টিয়ারের মাধ্যমে দায়িত্ব নেয়, তাহলে ফায়ার হাইড্রেন্ট দিয়েই আগুন নেভাতে যাবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমে যাবে।
ভিন্নবার্তা ডটকম/এন