1. admin-1@vinnabarta.com : admin : admin
  2. admin-2@vinnabarta.com : Rumana Jaman : Rumana Jaman
  3. admin-3@vinnabarta.com : Saidul Islam : Saidul Islam
  4. bddesignhost@gmail.com : admin : jashim sarkar
  5. newspost2@vinnabarta.com : ebrahim-News :
  6. vinnabarta@gmail.com : admin_naim :
  7. admin_pial@vinnabarta.com : admin_pial :
লকডাউন-বিধি নিষেধ

সঙ্কটে বিপর্যস্ত দরিদ্র ও শ্রমজীবীরা

সৈয়দ সাইফুল ইসলাম:
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১৬ জুলাই, ২০২১ ৩:৫১ pm

করোনার মধ্যে মানুষ এমনিতেই নানা সঙ্কটে রয়েছেন। এরই মধ্যে আবার যুক্ত হয়েছে নানা বিধিনিষেধ, কখনো কঠোর লকডাউন আবার কখনো বিধিনিষেধ সাময়িক সময়ের জন্য শিথিল। দীর্ঘদিন এই অবস্থার ফলে ব্যবসা গুটিয়ে, চাকরি হারিয়ে অনেকেই বিপদগ্রস্ত-ঋণগ্রস্ত। আবার যারা দিনমজুর, তারা রয়েছেন অর্ধাহারে-অনাহারে। রাজধানীসহ বড় শহরের গৃহকর্মী, বাস-টেম্পোচালক, হেলপার, হোটেল শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিকসহ হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। রাজধানীর বহু গৃহকর্মীকে কাজে আসতে বারণ করা হয়েছে। বাসের চালক ও সহকারী সাধারণত দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন। ১০ দিন বাস বন্ধ থাকলে তাঁরা কোনো মজুরি পাবেন না। একই অবস্থা কৃষি শ্রমিকদেরও। তাঁরা ক্ষেতখামারে কাজ করতে না পারলে মজুরি মিলবে না। অধিকাংশ শ্রমিকের জীবনের প্রায় একই দশা। এ অবস্থায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী ‘কঠোর লকডাউন’ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন ভুক্তভোগিরা। তারা বলছেন, দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত না করেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা এ-ও বলছেন, খাদ্যসহায়তা ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষকে ঘরে আটকে রাখা সম্ভব হবে না। তাই খাদ্যসহায়তা ছাড়া ঘোষিত এই লকডাউন আদৌ কার্যকর করা যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন অনেকে। অথচ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সাম্প্রতিক এক জরিপের ফলাফল বলছে, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশব্যাপী খানা জরিপের ভিত্তিতে এ তথ্য জানায় সংস্থাটি। তবে নতুন দরিদ্রের বিষয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের করা জরিপের ফলাফল স্বীকার করেননি সরকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল শ্রমজীবী গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু সরকারের দিক থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারের উচিত, কালবিলম্ব না করে তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি করা। যত বেশি পারা যায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমজীবী লোকজনকে সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। টাকার পাশাপাশি চাল-ডালের ব্যবস্থা করতে হবে। নজর রাখতে হবে সঠিক লোকটি যেন তা পান।

গত সোমবার (৫ জুলাই) থেকে ট্রাকে করে সরকার টিসিবি’র মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেয়। এই পণ্য ক্রয়ে দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তদের অনেকে লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য পায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, লকডাউনের কারণে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বেকার। ফলে তারাও টিসিবি থেকে পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। আর এ কারণেই টিসিবির ট্রাক পণ্যে সংকট তৈরি হয়েছে।

গত ১ জুলাই থেকে প্রথম দফার কঠোর লকডাউন ঘোষণার পর একজন পরিবহন শ্রমিকের জ্বালাময়ী বক্তৃতার একটি ভিডিও দেশজুড়ে ভাইরাল হয়। দেশবাসীর মধ্যে এ বক্তৃতা ব্যাপক সাড়া জাগায়। পরিবহন শ্রমিকের ওই বক্তৃতার চলমান লকডাউনের একটি খণ্ডচিত্র ফুটে উঠেছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে। প্রায় পাঁচ মিনিটের ওই ভিডিওতে লোকটির বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ জানিয়েছিলেন লকডাইন আর না বাড়াতে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, করোনা ভাইরাসের চাইতে তিনি লকডাউনকে বেশি ভয় পান। কিন্তু তার অনুরোধ রাখেনি সরকার। তিনি বলেন, জীবন আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি। করোনা হলে তা থেকে সেরে ওঠতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করার সামর্থ্য নেই তার। সে কারণে তিনি মনে করছেন, করোনায় মৃত্যু হলে সেটি হবে শহীদি মৃত্যু। দু’মুঠো ভাত খেয়ে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচার আকুতি জানিয়ে ওই শ্রমিক বলেন, লকডাউনের কারণে কাজকর্ম নেই, প্রায় তিন দিন ধরে না খেয়ে আছেন। কাজ না থাকলে ঘরে রান্না হয় না। এর আগের লকডাইনের সময় তার পরিবারের চিত্র তুলে ধরে ওই শ্রমিক বলেন, এর আগে লকডাউনের সময় আমার ৬ মাসের বাচ্চাকে স্ত্রী ছুড়ে ফেলে দিয়েছে আমার সঙ্গে রাগ করে। কারণ ছয় মাসের বাচ্চার দুধের ব্যবস্থা করতে পারিনি। স্ত্রীর ওই আচরণের কোনো প্রতিবাদ করার ভাষাও ছিল না আমার। রাগে-ক্ষোভে চার দিন স্ত্রী-সন্তানের সামনে এসে দাঁড়াইনি।

তিনি বলেন, করোনা ও লকডাউনে ধনীদের জন্য কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যারা দিনমজুর, দিন আনে দিন খায়, কর্ম না থাকলে পেটে ভাত জোটে না, সরকার কি তাদের কথা চিন্তা করে? তিনি বলেন, ১০ বছর লকডাউন দিলেও ধনীদের কোনো সমস্যা নেই। তারা ঘরের দরজা বন্ধ করে এসি রুমের মধ্যে বসে আরাম করতে পারবেন। অনেকের বিদেশে বাড়ি আছে, তারা চাইলে বিদেশেও চলে যেতে পারবেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষগুলো না খেয়ে মারা যাবে। তিনি আরও বলেন, যারা জনপ্রতিনিধি, তাদের পেট আটলান্টিক মহাসাগরের চাইতেও বড়। তারা গরিবের জন্য বরাদ্দকৃত রিলিফ নিজেদের পেটে ভরেন, এতেও তাদের পেট ভরে না। বস্তায় বস্তায় ত্রাণ দিলেও তা গরিব মানুষের হাতে পৌঁছায় না। এসব জনপ্রতিনিধি তাদের পেটের মধ্যে তা ঢুকিয়ে রাখেন। গরিব মানুষকে দু-একটি পোঁটলা দিয়ে সব নিজেরা ভোগ করেন। বিনয় প্রকাশ করে ওই শ্রমিক বলেন, জনপ্রতিনিদের মানুষ মোটেও বিশ^াস করেন না। এখন যদি কাউকে রিলিফ দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। আওয়ামী লীগের যারা ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম করছেন, তাদের নানা কথায় বকাবকি করেন এই যুবক।

সঙ্কট থাকলেও নীরব নিম্নমধ্যবিত্তরা
নিম্নমধ্যবিত্তরাও করোনাকালে সঙ্কটে রয়েছেন। তবে তারা সঙ্কটে থাকলেও রাস্তায় বের হতে পারছেন না লোকলজ্জায়। অনেকেই কর্ম হারিয়ে বেকার জীবনযাপন করছেন। ঋণগ্রস্ত হয়ে হতাশায় ভুগছেন অনেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবেচনায় ১০ শতাংশের মতো মানুষ আছেন, যাদের ধনী এবং উচ্চবিত্ত বলা যায়। যাদের হাতে আছে দেশের মোট আয়ের ৪৬ শতাংশ। উচ্চমধ্যবিত্ত ১৩ শতাংশের হাতে দেশের আয়ের ২১.৪৯ আয়, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ৩৭ শতাংশের হাতে ২৬ শতাংশ আয় এবং দরিদ্র মানুষ ৪০ শতাংশ, তাদের হাতে দেশের আয়ের ৭.৬৩ শতাংশ আছে বলে অর্থনীতিবিদ গবেষক আবুল বারকাত পরিচালিত অর্থনৈতিক জরিপে বলা হয়েছে। কর্মজীবী দরিদ্র যাদের মাসিক আয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা, তাদের কথা বাদ দিয়ে নিম্নমধ্যবিত্তদের কথাও যদি ধরি, যাদের মাসিক গড় আয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। স্বামী-স্ত্রী দুই সন্তান নিয়ে তাদের সংসার পরিচালনা করার সর্বনিম্ন খরচ কত হতে পারে? একটু হিসাব করে দেখা যাক! দুই রুমের একটা বাসা ঢাকা শহরের মিরপুর, মোহাম্মদপুর, লালবাগ, শাহজাহানপুর এলাকায় যদি হয়, তাহলে কমপক্ষে ১২ হাজার টাকা ভাড়া। মাসে ৫০ কেজি চাল, ১৫ কেজি আটা, ৫ লিটার তেল, দিনে এক টুকরো মাছ অথবা গোশত খেতে হলে মাসে ১৫ কেজি, ৫ কেজি ডাল, ২ কেজি চিনি, কাঁচাবাজার, মশলাপাতিসহ মাসিক খরচ হিসাব করুন! খুব কম করে হলেও মাসে অন্তত ১৫ হাজার টাকা। সন্তানের স্কুল, পড়াশোনা, কাপড়চোপড়, ডাক্তার, ওষুধ, অফিসে যাওয়া-আসা, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাওয়া, টেলিফোন খরচ, টেলিভিশন লাইন চার্জসহ আনুষঙ্গিক খরচ কীভাবে মেটানো সম্ভব? এর ওপর যদি বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, গ্যাসের দাম, পরিবহন ভাড়া বাড়তে থাকে, তাহলে মানসম্মত জীবনযাপন তো দূরের কথা, কোনো মতে বেঁচে থাকাই তো কঠিন হয়ে পড়ে।

সঙ্কটে দিন যাচ্ছে পরিবহন শ্রমিকদের
সরকার ঘোষিত লকডাউন, কঠোর লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ প্রায়। এতে চরম অর্থ সঙ্কটে পড়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। গত ৫ এপ্রিল থেকে গণপরিবহন বন্ধ ছিল ১৪ জুলাই পর্যন্ত আছে। এর মধ্যে দুই সিটে একজন করে যাত্রী পরিবহনসহ নানা শর্তে ১৫ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত গণপরিবহন চলাচলের অনুমোতি দিলেও সব মালিকরা রাস্তায় বাস নামায়নি। ফলে এই সেক্টরে কাজ করা শ্রমিকরা রয়েছেন বেকায়দায়। গণপরিবহন বন্ধের পর সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার কথা বলা হলেও তা শ্রমিকদের কাছে খুব একটা পৌঁছায়নি। আবার মালিকরাও এ সময়টিতে তাদের তেমন কোনো সহায়তা করেনি বলেই জানিয়েছেন চালক ও শ্রমিকদের অনেকে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বলছে, গণপরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৫০ লাখ শ্রমিক। এই ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত ২৪৯ শ্রমিক ইউনিয়ন রয়েছে। এদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামে একটি নাগরিক সংগঠন বলছে, কয়েক লাখ গণপরিবহন শ্রমিকের কোনো তথ্যভাণ্ডার নেই বাংলাদেশে। ফলে সরকারি বা বেসরকারিভাবে তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি এই করোনা মহামারির সময়। ‘এ খাতের শ্রমিকরা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। তাদের বেতন, বোনাস, ওভারটাইম ও কর্মঘণ্টা নির্ধারিত না হলে কেউ তো আসবে না। এর মধ্যেই অনেকে পেশা ছেড়েছেন। পেশাদার শ্রমিকরা চলে গেলে অরাজকতা বেড়ে যাবে’। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত বেসরকারি বাণিজ্যিক যান্ত্রিক এবং অযান্ত্রিক সড়ক ও নৌযান জরিপে দেখা গেছে, ৩১ লাখ ৬১ হাজার ১১৭ পরিবহন শ্রমিক রয়েছেন। দেশের পরিবহন খাতে নৌপরিবহনে কর্মরত রয়েছেন ৩ লাখ ৩ হাজার ৭৮৮ শ্রমিক। অন্যদিকে সড়ক পরিবহনে কর্মরত ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩২৯ শ্রমিক। সড়ক পরিবহনে মোট জনবলের ৫ লাখ ৮৩ হাজার ১৭৯ জন কাজ করেন সাধারণ রিকশায়। এছাড়া অটোরিকশা ও স্কুটারে ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৬৯ জন। সাড়ে ৪ লাখ মানুষ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ রিকশা-ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। এছাড়া চেয়ার কোচে ৮৩ হাজার ৩৯২, সাধারণ বাসে ৫৭ হাজার ২৮১, মিনিবাসে ৮০ হাজার, মাইক্রোবাসে ৮৫ হাজার ৭৩৬ ও নসিমন চালিয়ে ৮১ হাজার মানুষ সংসার চালান। আর ‘লকডাউনে’ বিপাকে পড়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার মোটরসাইকেল (রাইডশেয়ার) চালক। লকডাইনে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় এরা সবাই বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন।

অর্থকষ্টে ৩০ লাখ হোটেল শ্রমিক
গত ১ জুলাই থেকে সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউনের কারণে দেশের প্রায় ৩০ লাখ হোটেল শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় তাদের বকেয়া মজুরিসহ জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট মিষ্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়ন। ৩ জুলাই গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা কঠোর লকডাউনের কারণে বাংলাদেশের সব হোটেল বন্ধ রয়েছে। ফলে তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, যখন মোটা চাল ৪৮-৫০ টাকা, ডাল ১০০-১১০ টাকা, তেল ১৫০ টাকা, আলু ২৫ টাকা, তখন দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে শ্রমজীবী জনগণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দু’বেলা দু’মুঠো ডাল-ভাত জোটাতে পারে না, সেরকম অবস্থায় খাবার ছাড়া এই মানুষদের ঘরে থাকার কথা বলা তাদের সাথে উপহাস ছাড়া আর কী হতে পারে! দেশের শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা করে এমন একটি সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছরে কোভিডের কারণে হোটেল-রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকায় ১০ লাখ শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়েছেন।

৩৭ লাখ নির্মাণ শ্রমিক সঙ্কটে
করোনার কারণে নির্মাণ শ্রমিকরাও ঘরে বসে আছেন। তাদের কাজ নেই, আয় নেই। এই শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরেই অভাব-অনটনে রয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে কোনো সহায়তা পৌঁছায়নি। ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন প্রায় ৩৭ লাখ শ্রমিক। এরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু কর্ম ও জীবনের কোনো নিরাপত্ত নেই এদের। করোনার কারণে কাজ বন্ধ থাকায় অনেকের চুলা জ্বলছে না। কিন্তু দেখার কেউ নেই। ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে শ্রম আইনে মালিক, শ্রমিক ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘শিল্প স্বাস্থ্য সেফটি কমিটি’ গঠন করতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি কমিটি থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে এই কমিটি নেই। ফলে শ্রমিকের জীবন ও কর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শ্রমিকদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা মালিক পক্ষকে চাপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

৬ কোটি শ্রমিকের অধিকাংশই ঝুঁকিতে
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৭ লাখ। এ শ্রমশক্তির মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লাখ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। বাকি ২৭ লাখ বেকার। পরিসংখ্যান আরও বলছে, পরিবারের মধ্যে কাজ করেন, কিন্তু কোনো মজুরি পান না এমন মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ১১ লাখ। আর ১ কোটি ৬ লাখ আছেন দিনমজুর, যাদের কাজের নিশ্চয়তা নেই, নেই মজুরির কোনো নিশ্চয়তা। দেশে বিভিন্ন পেশার প্রায় সাত কোটি শ্রমিক রয়েছেন। এর মধ্যে ১০ শতাংশের কম শ্রমিকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি রয়েছে। বাকি প্রায় ৯২ শতাংশ শ্রমিকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। এর মধ্যে রয়েছে নির্মাণ শ্রমিক, জাহাজভাঙা শ্রমিক, গৃহশ্রমিক, মাটিকাটা শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, রিকশা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, জেলে বা মৎস্য শ্রমিকসহ আরও অসংখ্য কারখানা ও ক্যাটাগরির শ্রমিক। এদের মধ্যে প্রায় সব ধরনের শ্রমিকই এখর বেকার। এদের কোনো কর্ম নেই আয় নেই, পেটে ভাত নেই। এদের মধ্যে অধিকাংশই ঝুঁকিতে রয়েছে। গত বছর থেকে এ পর্যন্ত অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। লকডাউন দীর্ঘ হলে আরও অনেক শ্রমিকই বেকার হয়ে পরবেন। এতে সঙ্কট আরও বৃদ্ধি পাবে।

দরিদ্রদের কথা ভাবতে হবে
দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত না করেই কঠোর লকডাউন আরোপের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘প্রথমত, এটা কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত না এবং এটা ফলপ্রসূও হবে না। কারণ, লকডাউন কার্যকর করতে গেলে তার পূর্বশর্তগুলো পূরণ করতে হয়।’ কারণ ‘যেকোনো দেশেই যদি প্রকৃত অর্থে লকডাউন বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে এর দ্বারা যারা অ্যাফেক্টেড হবে, তাদের বিষয়গুলো বিবেচনার মধ্যে নিতে হয়। বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষ কাজ করেন। যারা সরাসরি আক্রান্ত। এর বাইরে আমরা যদি দোকান কর্মচারী কিংবা পরিবহন খাতের লোকজনদের ধরি, তারাও একটা বড় অংশ। অথচ লকডাউন আরোপের ক্ষেত্রে এদের বিষয়টি ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিভিন্ন দেশ লকডাউনে এই শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে টিকে থাকার জন্য কয়েক মাস ধরে সাপোর্ট দিয়ে গেছে। আমাদের দেশেও এটা হলে নিশ্চিত করা যেত যে, তারা ঘর থেকে বের হবে না। এখন কিছু না দিয়েই যদি তাদের ঘরে থাকতে বলা হয়, তখন তা একটা ডেসপারেট সিচুয়েশন তৈরি করে। তখন তারা নানা ধরনের রাস্তা খোঁজে।’ অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ হলো, ‘এ ধরনের ইল্লজিক্যাল (অযৌক্তিক), ইনকনসিসটেন্স (অসংগত) ও কন্ট্রাডিক্টরি (পরস্পরবিরোধী) সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই লকডাউন কার্যকর হয় না। মানুষ করোনায় যত অ্যাফেক্টেড হচ্ছে, করোনাকালে ব্যবস্থাপনার অভাব কিংবা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার চেয়ে বেশি।’
ভিন্নবার্তা ডটকম/এসএস

 



আরো




আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  

মাসিক আর্কাইভ