1. admin-1@vinnabarta.com : admin : admin
  2. admin-2@vinnabarta.com : Rumana Jaman : Rumana Jaman
  3. admin-3@vinnabarta.com : Saidul Islam : Saidul Islam
  4. bddesignhost@gmail.com : admin : jashim sarkar
  5. newspost2@vinnabarta.com : ebrahim-News :
  6. vinnabarta@gmail.com : admin_naim :
  7. admin_pial@vinnabarta.com : admin_pial :

দুর্ভিক্ষে খাবার বিলিয়েছেন, ৯০ বছর বয়সে নিজেই অনাহারে ফরিতন বেওয়া

ভিন্নবার্তা প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ৬:০৩ pm

মোস্তাফিজুর রহমান তারা, রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা: একদিন যাঁর হাতের তৈরি রুটি আর খিচুড়িতে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে ফুটেছিল স্বস্তির হাসি, যিনি মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই ফরিতন বেওয়া আজ নিজেই জীবনযুদ্ধের এক অসহায় সৈনিক। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শশরীর, প্যারালাইসিসে আক্রান্ত অসাড় পা, মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে সরকারি হেলিপ্যাডের পাশে একটি ভাঙাচোরা ছাপরা ঘর। একসময় মানুষের ক্ষুধা মেটানো এই বৃদ্ধার নিজের জীবনেই আজ নেমে এসেছে চরম অভাব, অসহায়ত্ব আর নিঃসঙ্গতার অন্ধকার।
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ৯০ বছর বয়সী ফরিতন বেওয়া যেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। অথচ ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম নেই, নেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কিংবা সম্মাননার কোনো চিহ্ন। যাঁর শ্রমে একদিন দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মুখে খাবার উঠেছিল, সেই মানুষটির আজ দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই ১৯৭৪ সালে খরা, বন্যা, ফসলহানি ও খাদ্যসংকটের ভয়াবহতায় দেশজুড়ে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। ক্ষুধা আর হাহাকারে ভারী হয়ে ওঠে বাংলার জনপদ। অসংখ্য মানুষ একমুঠো খাবারের আশায় ছুটে বেড়িয়েছেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।
সেই দুর্ভিক্ষের দিনগুলোতে রৌমারীতেও ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে বিভিন্ন স্থানে চালু করা হয়েছিল লঙ্গরখানা। দাঁতভাঙ্গা, যাদুরচর, নতুনবন্দর, রৌমারী কবরস্থানের পাশের মাদ্রাসা এবং তৎকালীন সিও অফিস—বর্তমান উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে তৈরি করা হতো রুটি ও খিচুড়ি। পরে সেই খাবার বিতরণ করা হতো অসহায় ও ক্ষুধার্ত মানুষের মাঝে।
সেই কঠিন সময়ে মানুষের জন্য খাবার তৈরির কাজে সহযোগিতা করেছিলেন ফরিতন বেওয়া। রৌমারী গ্রামের প্রয়াত আব্দুল হামিদের স্ত্রী তিনি। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ দিনগুলোতে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কঠিন সময়ে মানুষের জন্য খাবার তৈরির কাজে সহযোগিতা করেছিলেন ফরিতন বেওয়া। রৌমারী গ্রামের প্রয়াত আব্দুল হামিদের স্ত্রী তিনি। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ দিনগুলোতে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে তিনিও লঙ্গরখানায় রুটি তৈরি ও খিচুড়ি রান্নার কাজে যুক্ত ছিলেন।
সেদিন যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু বেঁচে আছেন ফরিতন বেওয়া। বেঁচে আছেন ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মৃতি হয়ে। তবে তাঁর নিজের জীবন আজ যেন সেই দুর্ভিক্ষেরই আরেক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতেও ছিলেন মানুষের পাশে
ফরিতন বেওয়ার জীবনের গল্প কেবল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় রৌমারীতে মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নার কাজে সহযোগিতা করেছিলেন তিনি। রৌমারী সিজিজামান হাইস্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের স্মৃতি আজও তাঁর মনে অমলিন।
স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি অবলীলায় বলে যান আলতাব সুবেদার, এনামুল সুবেদার, রিয়াজুল হাবিলদার ও জিয়াউর রহমানের উপস্থিতি এবং প্রশিক্ষণের নানা ঘটনা। সেই প্রশিক্ষণস্থলে রান্নার কাজ করার কথাও জানান তিনি।নব্বই বছরের জরাজীর্ণ শরীরেও ইতিহাসের সেই দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে যেন ফিরে পান হারানো সময়ের কিছুটা শক্তি। তাঁর স্মৃতিতে আজও জীবন্ত হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই দুর্লভ অভিজ্ঞতা।
কিন্তু জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় রাষ্ট্রের কাছে তাঁর প্রাপ্তি কী? মুক্তিযুদ্ধের সময় সহযোগিতা, দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য শ্রম—সবই যেন হারিয়ে গেছে সময়ের অতলে। তাঁর ভাগ্যে জোটেনি সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা, হয়নি স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা।
ভিটেমাটি হারিয়ে আজ সরকারি হেলিপ্যাডে আশ্রয়
একসময় সংসার ছিল, ছিল স্বজন, ছিল জীবনের স্বাভাবিক চলার পথ। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুরতায় আজ সবই যেন হারিয়ে গেছে।
ফরিতন বেওয়ার দুই মেয়ে। বড় মেয়েটি মারা গেছেন। ছোট মেয়ে স্বামীর বাড়িতে থাকেন, মায়ের কাছ থেকে দূরে। নিজের আত্মীয়স্বজন না থাকায় প্রায় ৪০ বছর ধরে কখনো দিনমজুরি, কখনো অন্যের বাড়িতে সহযোগিতা নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন তিনি।
বয়সের ভারে শরীর যখন আর সায় দিচ্ছে না, তখনই তাঁর জীবনে নেমে এসেছে আরও বড় বিপর্যয়। প্রায় তিন মাস ধরে হাঁটাচলা করতে পারছেন না তিনি। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে এখন ঘরবন্দি।
মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে সরকারি হেলিপ্যাডের পাশে একটি ভাঙাচোরা ছাপরা ঘর। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে, ঝড় এলে ভয়ে কাটে রাত। অসুস্থ শরীর নিয়ে সেখানেই দিন কাটছে তাঁর।
একসময় যাঁর হাতে তৈরি খাবার খেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের জীবন বেঁচে থাকার শক্তি পেয়েছিল, আজ সেই বৃদ্ধার নিজের জীবনই নির্ভর করছে অন্যের সামান্য সহযোগিতার ওপর।ইতিহাসের সাক্ষী, অথচ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে
ফরিতন বেওয়ার জীবনের গল্প আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে—যাঁরা দেশের দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের শেষ বয়সের দায়িত্ব কি সমাজ ও রাষ্ট্রের নয়?
মুক্তিযুদ্ধের সময় সহযোগিতা করেছেন, দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য রুটি বানিয়েছেন, জীবনের দীর্ঘ সময় অন্যের বাড়িতে কাজ করে কাটিয়েছেন। অথচ আজ তাঁর নিজের জীবনই অনিশ্চিত।

তাঁর বয়স ৯০ বছর। শরীর অসুস্থ। চলাফেরা করতে পারেন না। নেই স্থায়ী বাসস্থান, নেই নিশ্চিত জীবিকার ব্যবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর পাশে দাঁড়ানো কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং ইতিহাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও অংশ।

ফরিতন বেওয়ারমতো মানুষদের জীবনকথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু বড় বড় নেতা, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের গভীরে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য সাধারণ মানুষের অসাধারণ অবদান। তাঁদের শ্রম, ত্যাগ ও সহযোগিতায় রচিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা ও সমাজের কঠিন সময়ের সংগ্রাম।

কিন্তু তাঁদের অনেকের জীবনই শেষ বয়সে এসে পরিণত হয়েছে অবহেলা আর বঞ্চনার গল্পে।ফরিতন বেওয়ার মতো মানুষদের জীবনকথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু বড় বড় নেতা, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের গভীরে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য সাধারণ মানুষের অসাধারণ অবদান। তাঁদের শ্রম, ত্যাগ ও সহযোগিতায় রচিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা ও সমাজের কঠিন সময়ের সংগ্রাম।
কিন্তু তাঁদের অনেকের জীবনই শেষ বয়সে এসে পরিণত হয়েছে অবহেলা আর বঞ্চনার গল্পে।

মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় ফরিতন বেওয়া
ফরিতন বেওয়ার মতো অসহায় বৃদ্ধার জন্য এখন প্রয়োজন জরুরি মানবিক সহায়তা। তাঁর চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান, খাদ্য ও নিয়মিত দেখভালের ব্যবস্থা করা জরুরি।
স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি এবং মানবিক সংগঠনগুলোর কাছে প্রত্যাশা—তাঁর জীবনযাপনের দুর্দশা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। মুক্তিযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের স্মৃতিবিজড়িত এই বৃদ্ধার জীবনের শেষ দিনগুলো যেন অন্তত নিরাপদ আশ্রয় ও সম্মানের সঙ্গে কাটে।
একদিন তিনি মানুষের ক্ষুধা মেটাতে রুটি বানিয়েছিলেন। আজ তাঁর নিজের ক্ষুধা, অসুস্থতা ও অসহায়ত্বের কথা শোনার মানুষ কোথায়?ফরিতন বেওয়ার ভাঙা ছাপরা ঘরটি শুধু একজন বৃদ্ধার আশ্রয়হীনতার প্রতীক নয়; এটি আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং ইতিহাসের প্রতি সম্মানেরও এক কঠিন পরীক্ষা।

যে হাত একদিন দুর্ভিক্ষের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য রুটি বানিয়েছিল, সেই হাত আজ অসহায়ভাবে অপেক্ষা করছে একটু সহায়তার জন্য।

ফরিতন বেওয়ার এই অপেক্ষা যেন আর দীর্ঘ না হয়। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন অবহেলার অন্ধকারে নয়, বরং মানবিকতার আলোয় লেখা হয়।



আরো




আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 ১২৩৪৫৬
৭৮৯১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  

মাসিক আর্কাইভ