
আবারো তিন বছর মেয়াদ বাড়ছে ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম খানের। গতকাল শনিবার অনলাইনে ওয়াসা বোর্ডের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে বৈঠকে কিছু কিছু সদস্য এর বিরোধিতা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে বৈঠকে কয়েকজন সদস্য এমডির বিরুদ্ধে আসা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন তদন্ত কমিটি ও সুষ্ঠু তদন্ত চেয়েছেন। একইসঙ্গে মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন। অন্যদিকে, তাকসিম এ খানের বদলে ওয়াসায় নতুন এমডি চায় টিআইবি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাকসিম খান টানা ১১ বছর ধরে ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মেয়াদ শেষে ফের মেয়াদ বাড়ে। বাড়ে অনিয়মের অভিযোগও। প্রথমবার অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগের পর মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তাও উবে গেছে। শেষবার আইন ভেঙে ওয়াসা বোর্ডের কাছে উল্টো প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ আসে মন্ত্রণালয় থেকেই। নিয়োগ ও প্রকল্প নিয়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ গড়িয়েছে দুদক পর্যন্ত। বিভিন্ন কমর্কান্ড নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটানা ক্ষমতায় থেকে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ওয়াসা বোর্ডকে তোয়াক্কা না করে ষষ্ঠ দফায় মেয়াদ বাড়াতে সব ধরনের চেষ্টা করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যার ফলে ছুটির দিনেই বৈঠক ডাকেন ওয়াসার এমডি তাসকিম এ খান। নিজের মেয়াদ আরেক দফা বাড়ানোর লক্ষ্যে গতকাল এমডি অনলাইনে একটি বিশেষ সভা আহ্বান করেন। ইস্যুকৃত চিঠিতে সুস্পষ্টভাবে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে তাসকিম এ খানের মেয়াদ আরো ৩ বছর বাড়ানোর কথা এজেন্ডা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গতকালের বৈঠকে তাকসিম এ খানকে আরো তিন বছর মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বোর্ডসূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, ২০০৯ সালে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় সংবাদপত্রে। এমডি পদের জন্য চাওয়া হয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা অথবা সাধারণ প্রশাসনে সিনিয়র পর্যায়ের অভিজ্ঞতা। কিন্তু পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন বিষয়ক কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও আবেদন করেন প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। পরে ৩ বছরের জন্য তাকেই নিয়োগের সুপারিশ করে বোর্ড। অনুমোদনও দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। পরে ২০১২ সালে ৩ বছরের সুপারিশের বিপরীতে মেয়াদ বাড়ে ১ বছর। তৃতীয় দফা নিয়োগে ঘটে তেলেসমাতি। তৎকালীন স্থানীয়সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশের বাইরে থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড। কিন্তু ১ বছর আগের সুপারিশ আমলে নিয়ে আরো ২ বছরের জন্য নিয়োগ পায় তাকসিম এ খান। ওয়াসা বোর্ডের বৈঠকে এ বিষয়ে সমালোচনা হয়। আইনের সাথে সামঞ্জস্য নয় বলেও মত দেয় বোর্ড কর্তারা। কিন্তু অতীত বিবেচনা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বিব্রত বোধ করেন তারা। পঞ্চম মেয়াদে ঘটে আরো নজিরবিহীন ঘটনা। আইন অনুযায়ী ওয়াসা বোর্ড নিয়োগের প্রস্তাব দেবে, অনুমোদন করবে সরকার। কিন্তু ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ-ই উল্টো তাকসিম এ খানকে আরো ৩ বছরের জন্য নিয়োগের প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেয়। ঘটেও তাই। এভাবে গত ১১ বছর ধরে স্বীয় পদে বহাল তাকসিম এ খান। এখন নতুন করে তাকে আরো তিন বছর স্বপদে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াসা বোর্ড।
এদিকে, তাকসিম এ খানের নিয়োগ ‘বিতর্কিত’ এবং তাকে একাধিকবার পুনঃনিয়োগের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাকসিম এ খানকেই ফের ঢাকা ওয়াসার এমডি পদে পুনঃনিয়োগের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ডাকা বোর্ড সভারও নিন্দা জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি। তাকসিম এ খানের পরিবর্তে টিআইবি ঢাকা ওয়াসায় নতুন এমডি নিয়োগের দাবি জানিয়েছে।
গতকাল শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি’র পক্ষ থেকে এসব কথা বলা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার এ উদ্যোগের বিরোধিতা জানিয়ে টিআইবি বলছে, বর্তমান এমডিকে অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূতভাবে পুনঃনিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে গতকাল শনিবার ঢাকা ওয়াসা বোর্ড যে বিশেষ বৈঠক করেছে তা দুর্নীতির সুরক্ষামূলক উদ্যোগ। সভার আলোচ্যসূচির ভাষায় এটি স্পষ্ট বরাবরের মতো এবারও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ঢাকা ওয়াসার শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় একই ব্যক্তির অনৈতিক ও অবৈধ বহাল অব্যাহত রেখে দীর্ঘকালের লালিত এককেন্দ্রিক আধিপত্যবাদ অপরিবর্তিত রাখার সব ব্যবস্থা করে ফেলা হয়েছে। ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও অনিয়মের গুরুতর সব অভিযোগ থাকার পরও এই পদে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ ও অব্যাহত পুনঃনিয়োগ ওয়াসায় শুদ্ধাচার তথা সার্বিকভাবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারকে প্রহসনে পরিণত করেছে বলে মনে করে টিআইবি।
ভিন্নবার্তা/এসআর