
কিডনি সমস্যার ভেষজ চিকিৎসার নামে থাইল্যান্ডে ডেকে নিয়ে মোঃ এনায়েত হোসেন নামে নারায়নগঞ্জের এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হত্যার শিকার ব্যক্তির স্ত্রী তাহমিনা আক্তার ঢাকার সি.এম.এম আদালতে মামলা করেছেন। মামলা নং-৩০৮/২৪। মামলায় ভুয়া ডাঃ মুজিবর রহমানসহ তিনজনকে আসামী করা হয়েছে। মামলায় বাদী তাহমিন আক্তার জানান, আমার স্বামী শারীরিকভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক সকল কাজ কর্ম করছিলেন কিন্তু সামান্য কিডনী সমস্যা ছিল, এছাড়া হার্টের কোন সমস্যা ছিল না। তাকে চিকিৎসার নামে থাইল্যান্ড নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। থাইল্যান্ডে আমার স্বামীকে চিকিৎসার নামে অত্যাচার করা হয় এবং এক পর্যায়ে আমার স্বামী পানি চাইলে তাকে পানি দেওয়া হয়নি। এমনকি বেশী অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য আশেপাশের কোন হাসপাতালেও নেয়া হয়নি। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই, আর কোন স্ত্রী যেন স্বামী হারা না হয়, কোন মায়ের বুক যেন খালি না হয়, কোন সন্তান যেন এতিম না হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় ডাঃ মুজিবর রহমান নামে এক ব্যাক্তি থাইল্যান্ডে ভেষজ চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। সেখানে তার একটি ক্লিনিক রয়েছে বলে ইউটিউব এর মাধ্যমে প্রচার চালান এবং তার নিয়োগকৃত দালাল চক্রের মাধ্যমে তিনি থাইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য প্রলোভন দেখান যে সেখানে গেলে সকল রোগের চিকিৎসা হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে ইউটিউবে তার অনেক ভিডিও কন্টেট রয়েছে। ঢাকার শাহজাহানপুরের শান্তিবাগে তার চেম্বার ছিল, সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে থাকাকালে পোস্টাল অফিসার্স কোয়ার্টার, মতিঝিলে রোগী দেখতেন।
মামলা সূত্রে জানা যায় নারায়নগঞ্জ বন্দরে কেওঢালা এলাকার বাসিন্দা মোঃ এনায়েত সামান্য কিডনী রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এরমধ্যে মুজিবরের দালাল বাহিনীর সদস্য মোঃ রাসেল ও মনিরুল ইসলাম নামে দুজন তাকে জানায় যে মুজিবর রহমান নামে এক ডাক্তারের চিকিৎসা নিলে তিনি সম্পূর্ন সুস্থ হয়ে যাবেন। দালালদের সাথে এনায়েত গত বছরের ২৬ মে মুজিবরের শান্তিবাগের বাসায় যান। মুজিবর রহমান তাকে কিছু লতাপাতার ওষুধ দেন এবং সমস্যা হলে তিনদিন পর দেখা করতে বলেন। কিন্তু লতাপাতার কোন কার্যকারিতা না দেখে ২৯ মে পুনরায় মুজিবর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে এ সময় দালাল রাসেল ও মনিরুল জানায়, এখানে চিকিৎসা করালে তেমন কোন চিকিৎসা পাওয়া যাবে না বরং আপনি থাইল্যান্ডে যান এবং সম্পূর্ন সুস্থ হয়ে দেশে আসতে পারবেন। দালালদের কথায় এনায়েত রাজি হয়ে যান এবং ভিসা করতে দালালদের কাছে ১০ হাজার টাকা দেন। তারা জানায় যে আসা যাওয়া ও চিকিৎসা সহ যাবতীয় খরচ নিজের এবং যাওয়ার সময় যেন ১,৩০০ ডলার নিয়ে যায়, যা থাইল্যন্ডের ক্লিনিকে দিতে হবে। থাইল্যান্ডে যাওয়ার জন্য মুজিবর রহমান ২৬ জুলাই এনায়েতকে একটি ইনভাইটেশন লেটার দেন। ভিসা হওয়ার পর ১৫ আগস্ট এনায়েত দালাল রাসেল সহ থাইল্যান্ডে যান, এনায়েত মুজিবর রহমানের ক্লিনিকে প্রবেশের আগেই দালাল রাসেল এনায়েতের কাছ থেকে ১,৩০০ ডলার নিয়ে মুজিবরকে দেয়। সেখানে যাওয়ার পর এনায়েত দেখতে পান যে এটা একটা পুরাতন বাসাবাড়ি, সেখানে ক্লিনিক বা ডাক্তারের বা হাসপাতালের কোন কিছু নেই, নিচ তলায় মুজিবর রহমান দ্বিতীয় স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের নিয়ে থাকেন আর দ্বিতীয় তলায় এনায়েতকে একটি রুমে থাকতে দেন। পরেরদিন সকালে এনায়েত মুজিবর এবং দালাল রাসেলকে জিজ্ঞাসা করেন যে আপনাদের ইউটিউবে যে ক্লিনিকের কথা বলা হয়েছে এবং আপনারা যে ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসছেন সেখানে কখন যাব? এ প্রশ্ন করাতে মুজিবর ও তার লোকজন ক্ষিপ্ত হন এবং বলেন যে এটাই ক্লিনিক এবং এনায়েতকে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন। এনায়েত নিরুপায় হয়ে পরেরদিন তার ডলার ফেরত চান এবং দেশে ফেরার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। এই ঘটনায় মুজিবর ও তার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে এনায়েতের সাথে দুর্ব্যবহার করেন এবং পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখেন। এছাড়া চিকিৎসার জন্য তাকে দেশ থেকে আরও তিন হাজার ডলার আনার জন্য চাপ দিতে থাকেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এনায়েত হোসেনের স্ত্রী মামলায় আরও উল্লেখ করেন, তার স্বামীর সাথে ওয়্যাটসঅ্যাপে ১৮ আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটায় কথা হয় এবং জানায় যে রাতে তাকে জোর করে কিছু একটা খাওয়ানো হয়েছে, সে তখন থেকেই অনেক অসুস্থ। এটাই ছিল স্বামীর সাথে স্ত্রীর শেষ কথা। এরপর তিনি তার স্বামীর সাথে আর কোন যোগাযোগ করতে পারেনি। এরপরই ১৮ আগস্ট সকাল ১১ টায় ডাঃ মুজিবর রহমানের সহযোগী রাসেল তাকে জানান, তার স্বামী হার্ট এ্যাটাক করে মারা গেছেন এবং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেন। এ সময় ডাঃ মুজিবর রহমান রাসেলের ফোনের মাধ্যমে তাহমিনা আক্তারকে জানান এনায়েত হোসেন হার্ট এ্যাটাক করে মারা গেছে। এ সময় ডাঃ মুজিবর রহমান তাকে বিভিন্ন হুমকি ও মামলা করতে নিষেধ করে। এক পর্যায়ে তিনি ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ^াস দেন। বলেন, এটা একটা দুর্ঘটনা; তোমরা কারও সাথে বলো না, আমি দেশে আসতেছি তোমাদের যাবতীয় ক্ষতিপূরন দেব এবং তোমার স্বামীর লাশ বাংলাদেশে নেয়ার যাবতীয় খরচ আমি দিয়ে দেব। মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মামলার বাদী তাহমিনা আক্তার আরও বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে ১৮ আগস্ট আনুমানিক ১০টার দিকে ডাঃ মুজিবর রহমান ২/৩ জন সহযোগীসহ এনায়েত হোসেনের আটকে রাখার কক্ষে আসেন এবং দেশ থেকে আরো তিন হাজার ডলার আনার জন্য বলেন। কিন্তু তিনি রাজি না হলে তার উপর শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং এক পর্যায়ে জোর করে বিষাক্ত তরল খাওয়ানো হয়। এতে এনায়েত হোসেন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি পানি চাইলেও তাকে পানি দেয়া হয়নি। এমনকি তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালেও নেয়া হয়নি। এভাবে ডাঃ মুজিবর রহমান সহ অভিযুক্ত আসামীরা তাকে হত্যা করেন বলে বাদী মামলায় উল্লেখ করেছেন। এমনকি পরবর্তীতে লাশ দেশে আনতেও কোন সহযোগিতা করে নাই। সেখানে অন্যদের সহযোগিতায় পরে লাশ দেশে আনা হয়। মামলায় আরো উল্লেখ করা হয়, এনায়েত হোসেনের স্ত্রী সম্প্রতি জানতে পারেন ডাঃ মুজিবর রহমান দুই বার দেশে এসেছেন। কিন্তু তিনি তাদের সাথে দেখা করেননি। সম্প্রতি ডাঃ মুজিবর রহমানের দেশে আসার খবর পেয়ে তিনি এ বছরের ৯ মে, ১৯৯/২, তার শান্তিবাগের বাসায় যান, সেখানে গেলে অকথ্য ভাষায় গালাগালি দেয়াসহ নানা রকম হুমকি-ধামকি, ভয় ভীতি প্রদান করেন এবং একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়।
তাহমিনা আক্তার মামলায় উল্লেখ করেন, খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পেরেছি, ডাঃ মুজিবর রহমান নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিলেও তিনি প্রকৃতপক্ষে কোন ডাক্তার নন। তার কোন একাডেমিক সনদ নেই। তিনি মাঝে মাঝে থাইল্যান্ড যান এবং মানবপাচারের সাথেও জড়িত। তার মোহাম্মদ রাসেল ও মনিরুল ইসলামের মত কিছু দালাল রয়েছে যারা রোগী সংগ্রহ করে থাইল্যান্ডে নেয়ার ব্যবস্থা করে। এছাড়া রোগীর নামে অন্য ব্যক্তিদের কেও সেখানে পাচার করা হয়। তাহমিনা আক্তার বলেন, আমার অবুঝ ৩টি নাবালিকা মেয়ে রয়েছে। তাদের নিয়ে এখন আমি খুবই কষ্টে দিনযাপন করছি। আমি বিষয়টি নিয়ে ঢাকা গোয়েন্দা অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ করি, গোয়েন্দা অফিস থেকে তার সাথে যোগাযোগ করলেও তিনি অনেকবার তারিখ দিয়েও যাননি। আমি তার ও তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুজিবর রহমান এমবিবিএস পাশ করেননি, ছাত্রাবস্থায় তিনি রাশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টেসের মালামাল পাঠাতেন। এরপর রাশিয়ায় ইলেকট্রনিক্সের ব্যাবসা করেন, বাংলাদেশেও আকিরা নামে ইলেকট্রনিক্সের ব্যবসা ছিল। রাশিয়ায় প্রতারনার দায়ে সে দেশের সরকার তাকে বের করে দেয় এবং সে থাইল্যান্ডের পাতায়ায় এসে চিকিৎসার নামে ভন্ডামির আস্তানা তৈরী করে। সেখানে থাইল্যান্ডের কোন লোক চিকিৎস নেয় না। যা শুধুমাত্র বাসাবাড়ি, যেখানে মুজিবর রহমানের নামে কোন সাইনবোর্ড নেই, ডাক্তার হিসেবে কোন লেখাও নাই অথচ তিনি নিজেকে ইউটিউবে ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দেন। দালালরাও উন্নত চিকিৎসার কথা বলে সেখানে বাংলাদেশ থেকে অসহায় নিরীহ রোগীদের নিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ বিষয়ে ডাঃ মুজিবর রহমানের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। মামলার ২নং আসামী ডাঃ মুজিবর রহমানের সহযোগী মোহম্মদ রাসেল বলেন, অভিযোগ সম্পূর্ন ভুয়া। ডাঃ মুজিবর রহমান একজন রিটায়ার্ড পারসন। তিনি এখন চিকিৎসা দিতে চান না। কিন্ত বাংলাদেশ থেকে অনেকে তার কাছে যায়। এতে তিনি আরো বিরক্ত হন। এনায়েত হোসেন সেখানে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। ওই দেশের নিয়ম অনুযায়ী রোগীর নিকটআত্মীয় ছাড়া কেউ তার লাশ নিতে পারে না। এজন্য আমরা সহযোগীতা করতে পারিনি। পুলিশ এসে দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা অভিযুক্ত হলেও পুলিশ এসে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতো। আমরা দেশেও আসতে পারতাম না। উনারা আমাদের ভুল বুঝছেন। এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি।