বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আসছে বানের পানির মতো। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল, এই অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই তার চেয়ে ১৪৭ কোটি ৭৩ লাখ ডলার বেশি এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। রেমিট্যান্সে ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে গেছে। অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে করোনাকালে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স বেশি পাঠিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, অর্থবছরের আড়াই মাসে প্রায় ৬ বিলিয়ন (৫৯৯ কোটি ৬৫ লাখ) ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা) দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে দেড় গুণ বেশি।
করোনাভাইরাসের মধ্যে প্রবাসী আয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা দিয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কিনে দাম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকা কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। দীর্ঘদিন ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সায় প্রতি ডলারের দাম আটকে রেখেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এখন কমে ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় নেমেছে। শুধু তাই নয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এই রেমিট্যান্সের টাকায় দেশের লাখ লাখ পরিবার চলছে। এই রেমিট্যান্সের কারণে ছোট ছোট ব্যবসাও হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা ধারণা করেছিলেন, কোরবানির ঈদের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রতি মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ১৭ দিনে প্রায় ১৪৩ কোটি ৪৪ লাখ (১.৪৩ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এই অঙ্ক গত বছরের সেপ্টেম্বরের পুরো মাসের প্রায় সমান। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসীরা ১৪৭ কোটি ৬৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসীরা ৪৫১ কোটি ৯২ লাখ ডলার পাঠিয়েছিলেন। আর ২০২০-২১ অর্থবছরের আড়াই মাসে (১ জুলাই থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর) ৫৯৯ কোটি ৬৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
রেমিট্যান্স বাড়ার নেপথ্যের কারণ হিসেবে হুন্ডি বন্ধ হওয়া এবং সরকারের দুই শতাংশ নগদ প্রণোদনাকে দেখা হচ্ছে। এছাড়া রেমিট্যান্স পাঠাতে যে ফরম পূরণ করতে হয়, তা সহজ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, করোনাকালে ইউরোপ এবং আমেরিকা থেকে আগের চেয়ে বেশি বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। এটাকে তিনি দীর্ঘমেয়াদের জন্য ভালো লক্ষণ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে যারা দেশে ফিরে আসার জন্য দিন গুনছেন তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণেও রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে রেকর্ড হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এর সঙ্গে ২ শতাংশ প্রণোদনা এবং দীর্ঘদিন বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় হুন্ডি কমে যাওয়ার কারণেও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে প্রবাসীরা ২৫৯ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। একক মাস হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনও এত পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি। শুধু তাই নয়, ইতিহাস বলছে এখন থেকে বিশ বছর আগে অর্থাৎ ২০০১-০২ অর্থবছরের পুরো সময়ে (১২ মাসে) রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫০ কোটি ১১ লাখ ডলার। আর করোনাকালে শুধু জুলাই মাসেই প্রবাসীরা তার চেয়ে বেশি ২৫৯ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। পরের মাস আগস্টে প্রবাসীরা ১৯৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
এদিকে রেমিট্যান্সে ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে গেছে। অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিভিন্ন দেশে থাকা ১ কোটির মতো বাংলাদেশির পাঠানো অর্থ। দেশের জিডিপিতে এই রেমিট্যান্সের অবদান প্রায় ১২ শতাংশের মতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এই অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্টে) ৪৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার রেমিটেন্স এসেছিল বাংলাদেশে, যা ছিল গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি।
বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়াতে গত বছরের মতো এবারও ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার। সে অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে প্রবাসীরা প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে ২ টাকা প্রণোদনা পাচ্ছেন। বাজেটে এজন্য ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করে কোনও কোনও ব্যাংক আরও ১ শতাংশ বেশি প্রণোদনা দিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট এক হাজার ৮২০ কোটি ৩০ লাখ (১৮.২০ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা। ওই অঙ্ক ছিল আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি।
ভিন্নবার্তা/এসআর
Editor: Rumana Jaman Shachi
Raipura House (2nd Floor), 5/A, Outer Circular Road
West Malibag, Dhaka-1217
Communication
E-mail: vinnabarta@gmail.com
Phone:+8802222220051