ভিন্নবার্তা প্রতিবেদক: গত ১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে ঘিরে দুই দিন আগ থেকে পুলিশ ঢাকা শহর ও ঢাকার প্রবেশমুখে সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার চেক করেছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল সমালোচনা চলছে। শুধু নেটিজেনরাই নন, দেশের প্রায় সব মহলে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে- দেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ছাড়াও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোও পুলিশের এ ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মী, বিশেষ করে সরকারবিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি করা; গ্রেপ্তার করা; সন্দেহভাজন কাউকে ৫৪ ধারায় আটক করা এমনকি বিরোধী মতের লোকজনের ওপর লাঠিপেটা করে আসছে পুলিশ, বলা যায় এসব পুলিশের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। এছাড়া পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে মাদক মামলার আসামি করার অভিযোগও আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার চেক করার মতো ঘটনার খবরও এর আগে শোনা যায়নি। ১০ ডিসেম্বর সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়। আর এই সময়ই মানুষে অধিকার খর্ব করার এমন নেতিবাচক ঘটনার সাক্ষী হলো বাংলাদেশ।
১৯৪৮ সালে ঘোষিত জাতিসংঘ মানবাধিকার ঘোষণার ১২ নম্বর আর্টিকেলে বলা হয়েছে, 'কারো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কিংবা তার গৃহ, পরিবার ও চিঠিপত্রের ব্যাপারে খেয়াল-খুশিমতো হস্তক্ষেপ কিংবা তার সুনাম ও সম্মানের ওপর আঘাত করা চলবে না। এ ধরনের হস্তক্ষেপ বা আঘাতের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে।'
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনসাধারণের নৈতিকতা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনতা রক্ষার অধিকার থাকিবে।' এখানে যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের মধ্যে টেলিফোন, মোবাইল ফোন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।
তার মানে কারো মোবাইল ফোনের গোপনীয়তার সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারের তরফে হয়তো বলা হতে পারে যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার স্বার্থে পথচারীদের মোবাইল ফোনের মেসেজ চেক করা হচ্ছে। কিন্তু তাতেই কি এটা জায়েজ হয়ে যায়? একটা আধুনিক সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্রে কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য একজন নাগরিকের মোবাইল ফোন চেক করতে পারে, যতক্ষণ না তার বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় বা যতক্ষণ না তাকে বড় কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহ করে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হয়? দেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নামে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, অথচ এই প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে সরকারকে কোন প্রশ্ন করছে না।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসি বাংলা প্রশ্ন তুলেছে ‘পুলিশ কি চাইলেই মোবাইল ফোন তল্লাশি করতে পারে?’ বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়, বিএনপির ঢাকা সমাবেশকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন আগে থেকেই পুলিশের পাহারা এবং তল্লাশি শুরু হয়েছিল। কিন্তু ঢাকায় আসা অনেক নেতা-কর্মী অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন, বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও তাদের তল্লাশি করেছেন। এই সময় তাদের মোবাইল ফোন খুলে ফটোগ্যালারি তল্লাশি করা হয়েছে বলে অনেক নেতা-কর্মী অভিযোগ করেছেন।
কিন্তু চাইলেই কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা কোন ব্যক্তি অন্য আরেকজনের মোবাইলের ফোনের মতো ব্যক্তিগত জিনিসে তল্লাশি করতে পারে? বাংলাদেশের আইন কী বলে? এসব ক্ষেত্রে প্রতিকারের কী উপায় রয়েছে?
রাজবাড়ী থেকে বিএনপির সমাবেশে মোহাম্মদ বাবুল বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’গাবতলীতে পুলিশ থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবো, কেন ঢাকায় এসেছি। বললাম আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাবো। তখন বলে মোবাইল বের করে ছবিগুলো দেখাও। সেখানে কিছু না পেয়ে ছেড়ে দিয়েছে।’ তিনি জানান, পুলিশ মোবাইল চেক করছে জানতে পেরে ঢাকায় আসার আগেই গ্যালারি থেকে দলের ছবি বা ভিডিও ডিলিট করে দিয়েছিলেন। বিএনপির একাধিক নেতা-কর্মী অভিযোগ করেছেন, এভাবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তারা পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের তল্লাশির শিকার হয়েছেন।
পুলিশের এরকম তল্লাশি ও মোবাইল ফোন চেক করার ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র। ১১ ডিসেম্বর রবিবার একটি বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘গোপনীয়তা একজন ব্যক্তির সংবিধান স্বীকৃত অন্যতম একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৩ এ এই অধিকারটি নিশ্চিত করা হয়েছে।‘ ’মুঠোফোনে মানুষের ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, তথ্য বা ছবি থাকতে পারে, যা ঘাঁটাঘাঁটি করা একজন ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকারের চরম লঙ্ঘন। এছাড়াও একজন ব্যক্তির গোপনীয়তার সাথে তার মর্যাদার সম্পর্ক জড়িত,’
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, মোবাইল ফোন পুরোপুরি একজনের ব্যক্তিগত একটি যন্ত্র। আদালতের আদেশ ছাড়া কোনভাবেই সেটা সার্চ করার এখতিয়ার কারও নেই। কারণ এই ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার তাকে বাংলাদেশের সংবিধানে দেয়া হয়েছে। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, মোবাইল হচ্ছে খুব পার্সোনাল একটি গ্যাজেট, যেটা মালিকের পারমিশন ছাড়া ধরার কারও আইনগত এখতিয়ার নেই। যদি কোন মামলার অংশ হিসাবে মোবাইল ফোন আদালতে উপস্থাপন করা হয়, তখন আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তকারী ব্যক্তিরা সেটা দেখতে পারবে। এছাড়া আর কোন সুযোগ নেই। আমাদের সংবিধানে নাগরিকদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের গোপনীয়তার যে নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, সেটার গুরুতর লঙ্ঘন। একপ্রকার ফৌজদারি অপরাধের মধ্যেও পড়ে।
তল্লাশির নামে হয়রানি প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক সাংবাদিকদের বলেছেন, "অপরাধীদের ধরতে পুলিশ বিশেষ চালাচ্ছে। তল্লাশির সময় মোবাইল ফোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে নিরাপত্তার স্বার্থেই। তবে পুলিশের কোন সদস্য অহেতুক কাউকে হয়রানি করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভিন্নবার্তা ডটকম/এন
Editor: Rumana Jaman Shachi
Raipura House (2nd Floor), 5/A, Outer Circular Road
West Malibag, Dhaka-1217
Communication
E-mail: vinnabarta@gmail.com
Phone:+8802222220051