ঢাকা মহানগরী উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কিন্তু উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দুই সিটি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারছে না প্রতিষ্ঠান দুইটি। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে ঢাকা হবে বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্য নগরী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যায় জর্জরিত রাজধানী ঢাকা। এসব সমস্যা সমাধানের কাজ করছে দুই সিটি। বিশেষ করে এসব সমস্যা সমাধানে ১১টি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে দুই সিটিকে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলেই ঢাকাকে বিশ্বের অন্যতম উপযুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে, সড়ক সংস্কার, নগর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, বেদখল সম্পত্তি উদ্ধার, আর্থিক সংকট সমাধান, কমন ইউটিলিটি টানেল নির্মাণ, যানজট নিরসন, রিকশা নিয়ন্ত্রণ, রাস্তায় ময়লার কনটেইনার সরানো, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ভৌত অবকাঠামো ঠিক করা, ৫৭টি খেলার মাঠ ও পার্কের উন্নয়ন ও দখলমুক্ত করা এবং নগরবাসীকে মশা আর মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়া।
সড়ক সংস্কার : দুই সিটি এলাকার প্রায় ২২০০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অধিকাংশ সড়কেরই অবস্থা নাজুক। এসব সড়ক পিচ ঢালাই, খোয়া উঠে গর্ত হয়ে আছে। কোনো কোনো সড়কের পিচ ঢালাইও নেই। পুরান ঢাকার লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, জুরাইন, সায়েদাবাদ, ওয়ারি, যাত্রাবাড়ী ও নতুন ঢাকায় রামপুরা, বাড্ডা, মগবাজার, খিলগাঁওসহ কয়েকটি এলাকার অলিগলি ঘুরে সড়কের বেহাল চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। মহানগরীর পাড়ামহল্লার সড়কগুলোরও বেহাল দশা। এখন নতুন মেয়র ও কাউন্সিলরদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এসব সড়ক সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা।
সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় : ঢাকায় প্রায় ২০টি মন্ত্রণালয়ের অধীন ৫৩টির অধিক প্রতিষ্ঠান সেবা দিয়ে থাকে। অথচ উন্নত বিশ্বে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য নগর সরকার রয়েছে। ঢাকায় এ ব্যবস্থা না থাকায় যে কেউ যত্রতত্র সেবা দান করতে গিয়ে ডিসিসির রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন সম্পদের ক্ষতি করে থাকে, যার ক্ষতিপূরণ বহন করতে হয় খোদ সিটি কর্পোরেশনকেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারের সাথে সমন্বয়ের। অথবা এর বিকল্প হচ্ছে নগর সরকার গঠন করা।
মাঠ ও পার্ক দখল মুক্ত করা : এমনিতেই দিন দিন ইট-পাথরে ভরে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা। সে তুলনায় কোনো ফাঁকা জায়গা খালি পাওয়া যায় না। এরপরে দুই সিটির আওতায় ৪৭টি খেলার মাঠ ১০ পার্ক থাকলেও ১৭টি খেলার মাঠ ও পার্ক বেদখল রয়েছে। ডিসিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হয়নি উপরন্তু আরো বেদখল হয়েছে মাঠ ও পার্কগুলো। এর বেশ কয়েকটির বিরুদ্ধে রয়েছে মামলা। কিন্তু নানা কারণে মামলায়ও করপোরেশন জয়ী হতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, দুই সিটির আরো অনেক সম্পত্তি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। এসব সম্পত্তি উদ্ধারে কাজ করছে দুই সিটি। এখন এসব সম্পত্তি পুরোপুরি উদ্ধার করাও অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
আর্থিক সংকট : সেবার মান বাড়াতে ডিসিসিকে বিভক্ত করা হলেও বাড়েনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বর্তমানে দুই সিটির কোটি কোটি টাকা শুধু ঠিকাদারদের দেনা রয়েছে। এক্ষেত্রে উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে বেশি। বিগত বছরে বাজেটের অতিরিক্ত কাজকর্ম করতে গিয়েই মূলত আর্থিক দেনায় পড়ে ডিএসসিসি। এখন এ সংকট সমাধান করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কমন ইউটিলিটি টানেল : ঢাকায় বছরের প্রায় প্রতিটি দিনই কোনো না কোনো সরকারি সংস্থা সেবা দান করতে গিয়ে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করে থাকে। এ জন্য নগরীর রাস্তায় তীব্র যানজট এবং সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। উন্নত বিশ্বে ইউটিলিটি সার্ভিসের লাইন থাকে একটি কমন লাইন থাকে যা রাস্তার নিছে থাকে। কিন্তু ঢাকায় এক একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের এক একটি লাইন থাকায় লাইনে কোনো প্রকার ত্রুটি দেখা দিলে যত্রতত্র লাইন কাটতে হয়। ফলে বাড়ে দুর্ভোগ। এখন এ বিষয়টি সমাধান করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ছে।
যানজট : ঘর থেকে বের হলেই যানজটে নাকাল হতে হয় রাজধানীবাসীকে। কখনো কখনো ১০ মিনিটের রাস্তা এক ঘণ্টায় পার হওয়াও দুষ্কর হয়ে পড়ে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ঢাকাবাসী তার বয়সের ৭ বছরের বয়সের সমান আটকে থাকেন যানজটে। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অতিরিক্ত রিকশা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল রাস্তা, ফুটপাত দখল ও ভাঙা রাস্তাই এর জন্য দায়ী। ফলে নতুন রাস্তা তৈরি, ভাঙা রাস্তা মেরামত ও সরু রাস্তা বড় করার মতো কাজেও হাত দেয়ার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে দখল হওয়ার রাস্তা উদ্ধারে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
রিকশা নিয়ন্ত্রণ : জনসংখ্যার তুলনায় ছোট এই রাজধানীর বুকে রয়েছে প্রায় ১০ লক্ষাধিক রিকশা। যানজটের অন্যতম কারণ এই রিকশা। অধিকসংখ্যক রিকশার কারণে রাজধানীর অবস্থান হয়েছে এখন গ্রিনেস বুকেও। তবে অধিক সংখ্যক এই রিকশা নিয়ে চলছে এখন বাণিজ্য। বিভিন্ন সংগঠনের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে এই রিকশা থেকে চাঁদাস্বরূপ আয় করেন কোটি কোটি টাকা। অথচ এই রিকশাগুলোকে সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্সের আওতায় আনলে এ টাকাগুলো করপোরেশনের রাজস্ব খাতে জমা হতো। চাইলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখা মেয়রের পক্ষে সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে কাউন্সিলরদের ভূমিকা আগে রাখতে হবে।
রাস্তা থেকে ময়লার কনটেইনার অপসারণ : নগরবাসী প্রতিদিন গড়ে ৬ লক্ষ টন ময়লা বা বর্জ্য উৎপাদন করেন। এসব বর্জ্য রাখার জন্য সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সড়কের মোড়ে ৬৫০টি খোলা ময়লার কনটেইনার রাখা হয়েছে। এ কারণেও পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়। আর একটু বৃষ্টি হলে রাস্তায় জমে থাকা পানিতে ভাসতে থাকে ময়লা। অথচ নিয়ম অনুসারে, প্রতিদিনের আবর্জনা রাত ১২টার পর থেকে ভোরের মধ্যে অপসারণ শেষ হওয়ার কথা। এক্ষেত্রে মেয়রের চেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে কাউন্সিলরদের।
ফুটপাত দখলমুক্ত করা : রাজধানীর প্রায় প্রতিটি ফুটপাতই এখন বেদখল। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি মাসে দুই সিটি এলাকার ফুটপাত থেকে দুইশ কোটি টাকার ওপরে চাঁদা আদায় করে সরকারের দলীয় সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠন। তবে সমস্যা নিরসনে হকারদের ট্রেড লাইসেন্সের আওতায় এনে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ দুই সিটি অনেক আগেই নিয়েছে। এক্ষেত্রে বিষয়টি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে ।
ভৌত কাঠামো : দুই ডিসিসির একাধিক ওয়ার্ডে এখনো কোনো খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, পাঠাগার, শরীর চর্চা কেন্দ্র, মাতৃসদন, নগর হাসপাতাল, কলেজ, মহিলা কলেজ, জাদুঘর, নাট্যমঞ্চসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নেই। এক্ষেত্রে দক্ষিণের চেয়ে উত্তর অনেকটা পিছিয়ে। দুই সিটি জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য করপোরেশনের নিজস্ব কোনো জমি নেই। এজন্য এগুলো নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না। বিষয়গুলো নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি হলেও বর্তমান মেয়র ও কাউন্সিলরদের যৌথ উদ্যোগে এ সমস্যাটি মোকাবিলা করতে হবে।
মশা আর মাদকের অভিশাপ : এতোদিন ঢাকাবাসীর অন্যতম সমস্যা ছিলো মশা। মশার পাশাপাশি মাদকও নগরবাসীর যুব সমাজের জন্য এখন অভিশাপ। বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিয়েও নগরবাসীকে মশা থেকে রক্ষা করতে পারছে না দুই সিটি। বিনোদনের উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যুব সমাজ মাদকের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। তাছাড়া হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যাওয়াটাও এর অন্যতম কারণ। বর্তমানের নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে এই মশা ও মাদক নিয়ন্ত্রণ করা। নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, দিন দিন নগরী প্রায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। ফলে মেয়র ও কাউন্সিলরদের যৌথ উদ্যোগে এসব সমস্যা সমাধান করতে পারলে নগরী বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। না হয় ধীরে ধীরে নগরী আরো বসবাসের অযোগ্য হবে। ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, নগরীতে নানা সমস্যা রয়েছে। আমার প্রতিটি সমস্যা চিহ্নিত তরে তা সমাধানে কাজ করছি। এক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই ঢাকাকে একটি সুন্দর নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
ভিন্নবার্তা/এমএসআই
Editor: Rumana Jaman Shachi
Raipura House (2nd Floor), 5/A, Outer Circular Road
West Malibag, Dhaka-1217
Communication
E-mail: vinnabarta@gmail.com
Phone:+8802222220051