রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প বর্তমানে মাদক কারবারিদের জন্য যেন এক ‘স্বর্গরাজ্য’ হয়ে উঠেছে। প্রায় অর্ধশত বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা বিহারিদের পুনর্বাসনের জন্য গড়ে ওঠা এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা আজ মাদক ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কুখ্যাত। ক্যাম্পের প্রতিটি অলি-গলিতে মাদক ব্যবসা চলে প্রায় প্রকাশ্যেই।
ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের নেশাজাত দ্রব্য এখানে সহজলভ্য। তরুণ-যুবক থেকে শুরু করে নারীরাও এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও স্থানীয় দখলদার চক্রের সহযোগিতায় নিজেদের ক্ষমতার বলয় তৈরি করেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ক্যাম্পের ভেতরে প্রবেশ করলে বহিরাগতদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়, আর মাদকবিরোধী তৎপরতার চেষ্টা করলে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। অপরদিকে রাত নামলেই বেড়ে যায় মাদকসেবীদের আনাগোনা। যা পুরো এলাকাকে ভয়ের পরিবেশে আচ্ছন্ন করে রাখে। তবে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও মাদক চক্রের সদস্যরা অতি দ্রুত খবর পেয়ে যায়, ফলে অনেক সময় মূল হোতারা হাতছাড়া হয়।
মূলত মাদক কারবারি এবং পুলিশের সোর্সদের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এত কষ্টের অভিযান বিফলে যাচ্ছে। কেননা কোন যাচাই বাছাই ছাড়াই সোর্স নিয়োগ দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা। আর তারা অভিযানে যাওয়ার আগে সোর্সরা খবর পৌছে দেয় মাদক কারবারিদের কাছে। পুলিশের হয়ে কাজ করা এসব সোর্সদের বেশিরভাগ নিজেরাই মাদক ব্যবসায়ার সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
আর যখন যৌথবাহিনী অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়। এই সোর্সরা নিজ নিজ মাদক ব্যবসায়ীদের কে জানিয়ে দেন কোন সময় অভিযান শুরু হবে। বিনিময়ে তারা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকাও নিয়ে থাকে।
সম্প্রতি ভোরের ডাকের অনুসন্ধানে বেশ কয়েকজন সোর্সের নাম উঠে আসে। যারা অভিযানের আগে মাদক করাবারিদের সতর্ক করে দেন। এদের মধ্যে উল্লেখ্য যোগ্য কয়েকজন হলো- জেনেভা ক্যাম্প এর বাসিন্দা নান্নুর ছেলে শান্ত। শান্তের সাথে তার পরিবারের মধ্যে রয়েছে জিয়া, রাজু খোশবো। এরা শান্তের খালাতো ভাই ও বোন। আর শান্তর পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের নামে রয়েছে একাধিক মাদক মামলা। এদের সাথে রয়েছে শাহাজাদা, হৃদয়, কামরান। এ ছাড়া এদের সঙ্গে একসাথে মাদক ব্যবসায় আরও জড়িত রয়েছে পিচ্ছি রাজা, আলতাফ, সামসাদ, এরশাদ, আজাদ, ইমরান, শাকিরসহ অনেকে। তারা সবাই জেনেভা ক্যাম্পের এ ব্লকের বাসিন্দা। তারা সবাই দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। তাদের মধ্যে মূলহোতাই হলো নান্নুর ছেলে শান্ত। আর এই শান্ত মাদক ব্যবসার আড়ালে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা আকবর খান জানান, শান্ত মাদক ব্যবসায় জড়িত। সে ইতিমধ্যে কয়েকবার আটক হয়ে আবার জেল থেকে বের হয়ে একই কাজ করছে। পাশাপাশি সোর্স হিসেবে কিভাবে কাজ করছে আমাদের বোধগম্য নয়। তিনি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে অনুরোধ করে বলেন, কাউকে যদি নিজের সোর্স বানাতেই হয় তাহলে সঠিকভাবে তদন্ত করে ভালো মানুষকেই সোর্স বানানো প্রয়োজন। তাহলে মাদক নির্মূল করা সম্ভব। না হয় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানের সময় এই সোর্সরাই তাদের লোকদের সতর্ক করে দিয়ে মাদক ব্যবসাকে আরো চাঙ্গা করছে। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে আরও জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুরনো মাদক ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি নতুন করে অনেকেই এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। এদের মধ্যে রয়েছে, শাকির, শামির, আলতাফ, ইরফান, উল্টা সালাম, ফখলা, নাসিম, সেলিম খোকন, মানিক, শাহাআলম, ইমতিয়াজ, রনি, নাটু, সুমন, মনুসহ অনেকে। সম্প্রতি গোলাগুলিতে হত্যাসহ নানা অপরাধের সাথে এরাই জড়িত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দ্রুত এদের আইনের আওতায় এনে বাসিন্দাদের নিরাপদ বসবানের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা অভিযান নয়, বরং জেনেভা ক্যাম্পে সামাজিক পুনর্বাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না করলে মাদক ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না। অন্যথায় এই এলাকা মাদক কারবারিদের অব্যাহত স্বর্গরাজ্য হিসেবেই থেকে যাবে। তবে এই মাদক কারবারিদের দমনে ইতোমধ্যেই অভিযানে নামে সোনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী। সর্বশেষ গতকাল সোমবার মধ্যরাতে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে- শাহ আলম (২২) হত্যার সঙ্গে জড়িত চারজন রয়েছেন। একই সঙ্গে তাদের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্র, হেলমেট ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত কজরে ৪৬ স্বতন্ত্র ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিম আহমেদ জানান, অভিযানে গ্রেপ্তার ১৪ জনের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
Editor: Rumana Jaman Shachi
Raipura House (2nd Floor), 5/A, Outer Circular Road
West Malibag, Dhaka-1217
Communication
E-mail: vinnabarta@gmail.com
Phone:+8802222220051