প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার চীফ রিপোর্টার ও নগরসম্পাদক, বৃহত্তর কুমিল্লা সমিতির সভাপতি ও সাংবাদিক সমাজের প্রিয় মুখ হুমায়ুন কবীর খোকন। করোনার উপসর্গ নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। রাত সাড়ে ৯ টার দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পর পরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করোনা পরীক্ষার জন্য সেম্পল নেয়। বুধবার সকালে পজেটিভ রিপোর্ট আসে। এরপর থেকে তার স্ত্রী-সন্তানেরা হোম আইসোলেশনে আছেন।
মানুষ মরণশীল। প্রত্যেক মানুষকে একদিন দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। নির্ধারিত হায়াত শেষ হলে মউত আসবেই। ইচ্ছে করলেও কেউ এক সেকেন্ড বেশি থাকতে পারবে না। এর মধ্যেও কিছু মৃত্যু আছে যেগুলো মানুষের মনে দাগ কেটে যায়। মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। যেমন-সিলেট ওসমানী মেডিকেলের ডা. মাইনুদ্দিনের মৃত্যু। তার চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে কঠোর সমালোচনা হয়েছে।
এখন অনেকেই বলতে পারেন, সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের চিকিৎসায় তো কোনো অবহেলা ছিল না। রিজেন্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খোকনকে বাঁচানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। তার হায়াত শেষ ছিল। তাই তিনি চলে গেছেন। এটা নিয়ে তো আর বিশেষ আলোচনার কিছু নাই। না, তার মৃত্যু নিয়েও আলোচনার আছে। দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকা কর্তৃপক্ষে বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সব গণমাধ্যম যখন তাদের কর্মীদেরকে বাসায় থেকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে, তখন ওই পত্রিকা কর্তৃপক্ষ তাদের সংবাদকর্মীদেরকে অফিসে আসতে বাধ্য করেছেন। চাকরি বাঁচাতে তারা জীবনের ঝঁকি নিয়েও অফিসে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ওই পত্রিকার আরও কোনো কর্মী আক্রান্ত হলে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না।
তারপর সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের লাশের মান নিয়েও কথা আছে। কোনো চিকিৎসক, নার্স ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে বেতনের গ্রেড অনুযায়ী তাদের লাশের জন্য সরকার বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের লাশ কি কোনো গ্রেডে পড়ে? তিনিও তো দেশ ও জাতির স্বার্থে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। নাকি তারটা ‘গ্রেডহীন’ লাশ?
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস যখন দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লো তখনই চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আসে। তাদের সুরক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পিপিই’র ব্যবস্থা করা হয়। তখন প্রশ্ন আসে জীবনের ঝঁকি নিয়ে মাঠে ময়দানে কাজ করা গণমাধ্যমে কর্মীদের বিষয়টিও। তাদের পিপিই ব্যবস্থা করার জন্যও সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠে। কিন্তু তাদের সুরক্ষা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য আসেনি। ব্যবস্থা করা হয়নি পিপিই’রও। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একের পর এক গণমাধ্যমকর্মীরাও প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হতে থাকেন।
এরপর, সরকারের পক্ষ থেকে চিকিৎসক, নার্স, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত বা মৃত্যু হলে বেতন গ্রেড অনুযায়ী তাদের লাশের জন্য টাকা বরাদ্দ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, ১-৯ গ্রেডে বেতন প্রাপ্তরা আক্রান্ত হলে পাবেন ১০ লাখ টাকা, আর মারা গেলে পাবেন ৫০ লাখ টাকা। ১০-১৪ তম গ্রেডে বেতন প্রাপ্তরা আক্রান্ত হলে পাবেন ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আর মারা গেলে পাবেন ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ১৫-২০তম গ্রেডে বেতন প্রাপ্তরা আক্রান্ত হলে পাবেন ৫ লাখ টাকা, আর মারা গেলে পাবেন ২৫ লাখ টাকা।
এদিকে, জীবনের ঝঁকি নিয়ে মাঠে-ঘাটে কাজ করা সাংবাদিকদের জন্য প্রণোদনার দাবি জানালেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিবারই সাংবাদিকদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেছেন।
গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলেও ধন্যবাদ ছাড়া তাদের ভাগ্যে প্রণোদনার কোনো গ্রেড মিলেনি। এ হিসাবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মারা যাওয়া সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের লাশকে আমরা ‘গ্রেডহীন’ লাশ বলতে হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশ-মানুষের স্বার্থে কাজ করে গেলেও সরকারি ঝুঁকির খাতায় তার নাম নেই। এখন আমরা যদি বলি যে, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম এখন রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার তাহলে কি ভুল হবে?
প্রথম দিকে কয়েকজন সাংবাদিক করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই গণমাধ্যমে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের মৃত্যুর পর এ আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে। এই আতঙ্ক দূর করে দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদেরকে কোনো উৎসাহীত করা হচ্ছে না। অনেক সাংবাদিক এখন শুধু চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে-ঘাটে দায়িত্ব পালন করছেন। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার মালিক আল্লাহ। তাই আমরা এখন মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ! সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনের লাশ দুনিয়ার কোনো গ্রেড না পাইলে, তুমি তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ গ্রেডে আসীন করুন। আর যেসব সহকর্মীরা দেশ-মানুষের স্বার্থে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই দুর্যোগের সময় দাযিত্ব পালন করছেন, তুমি তাদেরকে রহমতের চাদর দ্বারা ঢেকে রেখো।
লেখক: সাংবাদিক
Editor: Rumana Jaman Shachi
Raipura House (2nd Floor), 5/A, Outer Circular Road
West Malibag, Dhaka-1217
Communication
E-mail: vinnabarta@gmail.com
Phone:+8802222220051