মেরিনা সুলতানা, একজন মা এবং একজন বিসিএস ক্যাডার সুপারিশপ্রাপ্ত। দীর্ঘ ত্যাগ আর পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তিনি আজ সফল। এর পেছনে রয়েছে অনেক রাত জাগার গল্পও। স্বামীর অনুপ্রেরণা, পরিবারের সহযোগীতা আর নিজের অদম্য ইচ্ছা শক্তির কারনেই সফল এই তরুনী।
৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষা কাড্যারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মেরিনা। লক্ষীপুরের আলহাজ্ব সার্জেন্ট আব্দুল কালাম ও হোসেনে আরা দম্পতির মেয়ে মেরিনা সুলতারা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দৃঢ়চেতা ও আত্মবিশ্বাসী। স্কুলে পড়া বয়েসেই তার অদম্য ইচ্ছা ছিলো বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। তাইতো পাঁচ মাসের ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়েই বিসিএসসের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন মেরিনা।
স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পরপরই পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ে হয় মেরিনার। বিয়ের পরে সাংসারিক বাস্তবতায় রঙিন জীবন ফ্যাকাসে হওয়ার ভয় পেয়ে বসে। পড়াশোনা, সংসার, শ্বশুরবাড়ির সবকিছু সামলে হাপিয়ে উঠতে হবে না তো এমন দু:চিন্তা যেনো রাত-দিন ঘুরপাক খেতো তার মগজের ভেতরে। তবে একসময় আত্মবিশ্বাস দিয়ে জয় করেন সবকিছু। এখন তার এ সফলতায় আপ্লুত তার পরিবার ও স্বজনরা।
বিয়ের পর থেকেই পড়াশুনা চালিয়ে যেতে স্বামী রেদোয়ানুল হক সব সময় রকমের সার্পোট দিয়ে গেছেন তাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। পড়াশুনার শেষ করেই বাচ্চা না নেয়ার প্ল্যান ছিলো মেরিনার। স্বামী রেদোয়ানুলও খুব সহজ ভাবেই মেনে নিয়েছিরো বিষয়টি। কিন্তু বিয়ের পাঁচ বছরের মাথাও বাচ্চা না থাকায় শ্বশুর বাড়িতে কিছুটা চাপে পড়তে হয়েছিলো মেরিনাকে। তবে স্বামীর সার্পোটের কারনে কেউ মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারেনি। বরং একের পর এক ভারো রেজাল্টে খুশি হয়ে শশুর-শাশুড়ি ননদ সহ বাকীরাও পড়াশুনা চালিয়ে যেতে মেরিনাকে ছাড়ার অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন।
নিজের সাফল্যের পেছনের কিছু খন্ড খন্ড গল্প তুলে ধরে মেরিনা জানান, আমার লক্ষ্য ছিল আগে নিজের পেশাগত যোগ্যতা অর্জন করব। ৩৮ বিসিএস এর প্রিলি উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমি আর আমার সময় নষ্ট না করে সিলেবাস অনুযায়ী বুঝে বুঝে প্রস্তুতি শুরু করি। যেহেতু মানবিক বিভাগের ছাত্রী ছিলাম তাই গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে বেশি জোর দেই। বাকি বিষয়গুলো ও নোট করে বিভিন্ন ভাবে তথ্য জোগাড় করে খাতায় লিখে তারপর পড়তাম। আমার বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার আগেই আমি গর্ভধারণ করি। তাই পরীক্ষাটা নিজের মনের মত করে দিতে পারেনি। মৌখিক পরীক্ষার সময় আমার ছেলের বয়স ছিল পাঁচ মাস।
তিনি বলেন, স্নাতকোত্তর শেষ করার পর থেকেই একটা চাকরী পাওয়ায় শংঙ্কা মানুষিক ভাবে বেশ ভোগাতো। কারণ বাংলাদেশের মত একটা বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষত দেশের সরকারের পক্ষে এতো ছেলেমেয়েকে চাকরি দেয়া অনেকটা সোনার হরিনের মতোই। আর বিসিএস এর মত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় টিকে থাকাটা তো আরো বড় ব্যাপার। তাই তখন থেকেই পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু করলাম।
সবশেষে আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি স্বামী বাবা-মা ননদ সবার সাহায্য-সহযোগিতা না থাকলে হয়তো আজ আমি এতদূর আসতে পারতাম না। এই সময়ের মধ্যে আমি হারিয়েছি আমার শ্বশুরকে, ফল প্রকাশের ২০ দিন আগে না ফেরার দেশে চলে গেলেন শাশুড়িও। তারা আমার পরীক্ষার ফলাফল দেখে যেতে পারলেন না। তবে শুকরিয়া মহান আল্লাহ তাআলার এবং সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
নারীদের উদ্দেশ্যে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত মেরিনা বলেন, সফলতার জন্য নারীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস। আমি মানুষ, আমি একটা আলাদা সত্ত্বা। আমাকে আমার লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। আর এজন্য যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো পরিশ্রম। সে বিষয়ে কখনোই পিছপা হওয়া যাবে না।
আত্মবিশ্বাসই সফলতার মূলমন্ত্র উল্লেখ করে আগামীতে বিসিএসসে উত্তীর্ণ হওয়ার স্বপ্ন সারথীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ধৈর্য্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে, বিশ্বাস রাখতে হবে। যে সময়টা পাওয়া যায় তার পুরোটা সঠিক ব্যবহার করতে হবে। কাজে লাগাতে হবে। আর পড়াশোনা চলাকালে সব রকম ডিভাইস থেকে দূরে থেকে একাগ্রচিত্তে যতটুকু সময় পড়ার, সে সময়টা পুরোপুরি পড়লে সফলতা আসবেই।
Editor: Rumana Jaman Shachi
Raipura House (2nd Floor), 5/A, Outer Circular Road
West Malibag, Dhaka-1217
Communication
E-mail: vinnabarta@gmail.com
Phone:+8802222220051