দেশের প্রায় সব জেলা ও উপজেলা শহরে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক (থ্রি হুইলার) অনেকটা প্রধান যানে পরিণত হয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানের সংখ্যাও বাড়ছে হু হু করে। মহাসড়কগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দেখা মেলে ধীরগতির এসব যানের। রাজধানী ঢাকার অলিগলিসহ আশপাশেও চলাচল করছে দাপটের সঙ্গে, যদিও এগুলোর বৈধতা নেই।
এ অবস্থায় বিপুলসংখ্যক অবৈধ এই মোটরযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ নিবন্ধনের আওতায় আনতে ইলেকট্রিক মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও চলাচল সংক্রান্ত নীতিমালা ২০২১-এর খসড়া চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে কোনগুলোকে ইলেকট্রিক যান হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তা নির্ধারণের জন্য বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে (এআরআই) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।
তবে গুঞ্জন আছে, এই নীতিমালার মধ্য দিয়ে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইককে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধীরগতির ইজি বাইক মূল সড়কে চলার উপযুক্ত নয়। এর কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। আর এসব মোটরযানে চার্জ দেওয়ার পদ্ধতি পুরোপুরি বাণিজ্যিক না হওয়ায় বিদ্যুৎ চুরির আশঙ্কা রয়েছে। আর পরিবেশের দোহাই দিয়ে ইলেকট্রিক মোটরযানকে যেভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, তা-ও ঠিক নয়। কেননা জীবাশ্ম জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পরিবেশের ব্যাপক দূষণ ঘটে। তাই ইলেকট্রিক মোটরযানের ব্যবহার বৃদ্ধি মানে পরিবেশের দূষণ বাড়ানো।
বর্তমানে দেশে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক (থ্রি হুইলার), রিকশা-ভ্যান, স্কুটি ও বাইসাইকেল চলতে দেখা যায়। ব্যাটারিচালিত বাস-ট্রাক বা ব্যক্তিগত গাড়ি নেই। সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক ও রিকশা-ভ্যানের সংখ্যা জানা না গেলেও তা ১০ লাখের কম হবে না বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নীতিমালায় ইলেকট্রিক মোটরযানের ১৪টি বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন বা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বা সোলার প্যানেলে অথবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে ইলেকট্রিক মোটরযানের ব্যাটারি চার্জের কথা বলা হয়েছে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত লেড এসিড ব্যাটারি ব্যবহার করা যাবে। রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ইঞ্জিনচালিত মোটরযানের প্রচলিত পদ্ধতিই ব্যবহৃত হবে। কী পরিমাণ যানকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হবে, সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) বা সংশ্লিষ্ট রুট পারমিট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেওয়া সংখ্যাকে বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাঁচ ভাগে জীবনকালও (লাইফটাইম) নির্ধারণ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সড়ক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ বলেন, নীতিমালার এসব বৈশিষ্ট্য ছোট ইলেকট্রিক মোটরযানের ক্ষেত্রে হয়তো রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এখানে বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়িও আছে।
সারা পৃথিবীতে ইলেকট্রিক মোটরযানের সংখ্যা মাত্র ২.৫ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই গাড়ি যদি আমদানিও হয়, তা চলার মতো অবকাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। ফলে রাতারাতি সড়কে গাড়ি বাড়তে থাকলে এক ধরনের ডিজাস্টার হবে, যদিও ব্যাটারি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মুখিয়ে আছে আইন পাসের অপেক্ষায়। এতে দেশে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যাটারির বাজার তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি সামনে রেখে মূলত ইজি বাইককে বৈধতা দিতেই এই নীতিমালা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, চার্জ দেওয়ার পদ্ধতি পুরোপুরি বাণিজ্যিক না হওয়ায় বিদ্যুৎ চুরির ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যে জ্বালানি ব্যবহার করা হয়, তাতেও পরিবেশদূষণ হয়। তাই পরিবেশদূষণের হুমকি বিবেচনার যে কথা বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। নীতিমালা পাস হওয়ার পর যেসব ইজি বাইক ফিটনেসসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে পারবে না, সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
এই উদ্যোগের সফলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এই বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, এরই মধ্যে করোনা মহামারির আগে ইজি বাইকগুলোকে রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ৫ শতাংশ ইজি বাইকও রেজিস্ট্রেশন করেনি। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনও মনে করেন, ইজি বাইককে বৈধতা দিতেই আইন করা হচ্ছে। তাঁর মতে, ইজি বাইককে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় না এনে বরং উল্টো বন্ধ করা উচিত। নিজের এই বক্তব্যের সপক্ষে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘এই যানের যে গতি তাতে এই যান মূল সড়কে চলার উপযুক্ত নয়। বহু দুর্ঘটনার কারণ ইজি বাইক। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ও বেকারত্ব কমাতে এর ভূমিকা নিয়েও তর্ক আছে। সে ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে কোনোভাবেই যেন আঞ্চলিক, বিভাগীয় বা জেলাভিত্তিক মহাসড়কে ইজি বাইক চলতে না পারে। যদি চলতে হয়, তাহলে সার্ভিস লেন দিয়ে চলতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘নীতিমালায় বলা হচ্ছে রুট পারমিটের ওপর ভিত্তি করে রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হবে। অথচ রুট পারমিটই দেওয়া হয় রাজনৈতিকভাবে। স্থানীয় রাজনৈতিক লোকেরাই রুট নিয়ন্ত্রণ করেন। ইজি বাইক সারা দেশে ভরে যাচ্ছে। এর সংখ্যা যে কত তা-ই কেউ বলতে পারছে না। ২০ লাখের বেশিও হতে পারে। এগুলো স্থানীয়ভাবে টিএনও এবং জেলা প্রশাসক লাইসেন্স দিচ্ছেন।’
তবে এআরআইয়ের পরিচালক আধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু ইজি বাইককে প্রাধান্য দিতে আইন করা হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। বরং বলা যায়, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। তবে খেয়াল রাখতে হবে, লাইফটাইম শেষ হওয়ার পর গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর যেন পুনরায় ব্যবহৃত না হয়।’ প্রধান সড়কে ইজি বাইক চলার অনুমতি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করেন তিনি।
আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সদস্যসচিব এবং বিআরটিএর উপপরিচালক শফিকুজ্জামান ভুঁইয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
ইজি বাইককে বৈধ করা এই নীতিমালার লক্ষ্য না মন্তব্য করে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ‘ইলেকট্রিক মোটরযানের একটি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বুয়েটের টেকনিক্যাল কমিটি যদি মনে করে ইলেকট্রিক মোটরযানের সংজ্ঞায় ইজি বাইক পড়ে, তাহলে এটি ইলেকট্রিক মোটরযান হবে, নতুবা হবে না। আর ইজি বাইকের সংখ্যা নিয়ে কোনো ডাটাবেইস নেই। ১০ লাখ, ২০ লাখ—এগুলো শোনা কথা। সংখ্যাটি তিন লাখও হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘সেফটি, সিকিউরিটির বিষয়টি নিশ্চিত করেই বৈধতা দেওয়া হবে। সব ঠিক থাকার পর ইজি বাইক যদি রেজিস্ট্রেশন পায়, তাহলে এর সংখ্যাও নির্ধারণ করা যাবে, সরকারও রাজস্ব পাবে।’
ভিন্নবার্তা ডটকম/পিকেএইচ
Editor: Rumana Jaman Shachi
Raipura House (2nd Floor), 5/A, Outer Circular Road
West Malibag, Dhaka-1217
Communication
E-mail: vinnabarta@gmail.com
Phone:+8802222220051