১. উপরের প্রশ্নটির সহজ উত্তর হচ্ছে- পল্লবী মন্ডলদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব বাংলাদেশের কেউ নেয় না এবং নেবে না। ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, শুক্রবার গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পল্লবী মন্ডল খুলনার ডুমুরিয়ায় নিজবাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পল্লবী মন্ডল বিভিন্ন কারণে হতাশা-বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। পত্রিকায় যে খবর আসেনি তা হচ্ছে পল্লবী কি বিষণ্ণতার জন্য কোনো চিকিৎসা নিচ্ছিলেন? তাকে চিকিৎসা দেয়ার মতো ডাক্তার ছিল? তাকে কি সঠিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া পল্লবী মন্ডলের ডিপ্রেশন ডায়াগনোসিস এবং চিকিৎসা করার জন্য কোনো ব্যবস্থা নিয়েছিল? যদি ডাক্তার চিকিৎসা না দিয়ে থাকেন, অথবা ডাক্তারের চিকিৎসায় ভুল থাকে , কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ছাত্রীকে যথাযথ সাপোর্ট দেয়নি- এসব কারণে কি কাউকে আইন আদালতের মুখোমুখি হতে হবে?
২. উপরের প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে - না, কাউকেই আদালতের মুখোমুখি হতে হবে না। সাধারণ আদালতের পক্ষে কি আত্মহত্যার ঘটনা তদন্ত করা সম্ভব? না, সম্ভব নয়। সেজন্য উন্নত বিশ্বে বিশেষ আদালত রয়েছে। ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে সেই বিশেষ আদালতের নাম হচ্ছে Coroner's Court. আত্মহত্যা বা সন্দেহজনক মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করার জন্য এই বিশেষ আদালত রয়েছে। বাংলাদেশে কোন কোন বেকুব মাঝে মধ্যে দাবি করেন যে, বাংলাদেশ কানাডা এবং সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির সমান বা তার চাইতেও উন্নত।
যদি তাই হয় তাহলে পশ্চিমা দেশগুলোর আদলে বাংলাদেশ Coroner's Court কেন স্থাপন করা হবে না?
৩. পল্লবী মন্ডল ছাড়াও ২০২১ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। সংখ্যাটির দিকে আবার খেয়াল করুন। ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী! এর বাইরে কতজন সাধারণ মানুষ আত্মহত্যা করেছেন? সঠিক হিসাব রাখার কোনো সিস্টেম আছে? কোনো মেকানিজম আছে? উত্তর হচ্ছে, আমার জানা নেই। না থাকার সম্ভাবনা প্রচুর। যদি প্রমাণ পেতে চান তাহলে একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন এই সংখ্যাগুলো আপনি পাবেন না। সঠিক সংখ্যা যদি না জানেন তাহলে আপনি কীভাবে বুঝবেন বাংলাদেশের মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? এতগুলো শিক্ষার্থী আত্মহননের নেশায় মেতে উঠল কেন? এই কারণগুলো বের করার দায়িত্ব কি আদৌ আছে? যদি থেকেই থাকে তাহলে দায়িত্বে অবহেলা করছে কে? এ ব্যাপারে আদালতের পক্ষ থেকে একটি স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ দেয়া যায় না? আত্মহত্যার সঠিক কারণ যদি নাই জানেন তাহলে প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করবেন কীভাবে?
৪. পল্লবী মন্ডলের আত্মহননের কয়েকদিন আগে ফেসবুক লাইভে এসে নায়ক রিয়াজের শ্বশুর আবু মহসিন খান নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। নিজের জীবন সংহারের আগে উনি অবশ্য কিছু কারণ উল্লেখ করে গেছেন। সেই কারণগুলো বিশ্লেষণ থেকে যা বুঝা যাচ্ছে তা হচ্ছে- বিভিন্ন কারণে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। এই বিষণ্ণতাই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবু মহসিন খানের মৃত্যুর জন্য আমাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই? সবটুকু ভুল উনার পরিবার আর বন্ধু-বান্ধবের? রাষ্ট্র তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কী করেছে? রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ছিল কোথায়? চিকিৎসকদের গাফিলতি ছিল কোথায়? এসবের কোনো তদন্ত হবে না?
৫. বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, যারা আত্মহত্যা করেন তাদের প্রায় সকলের কোন না কোন সাইকিয়াট্রিক বা সাইকোলজিকাল প্রবলেম আছে। আত্মহত্যাকারীদের শতকরা ৭০-৯০ জন depression বা বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। মজার ব্যাপার হলো, বিষণ্নতায় আক্রান্ত রোগীদের ৮০-৯০ ভাগ খুব সামান্য চিকিৎসাতেই সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। বাংলাদেশ কি এই 'সামান্য চিকিৎসা' দেয়ার ক্ষমতা রাখে না?
৬. সন্দেহ নেই যে, বিষণ্ণতার পেছনে আর্থিক, সামাজিক এবং পারিবারিক কারণ রয়েছে। আর্থিক-সামাজিক এবং পারিবারিক সমস্যা থাকলেই কি সবাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়? উত্তর হচ্ছে, না। শুধুমাত্র যারা বিষণ্ণতায় বা অন্যান্য সাইকোলজিক্যাল সমস্যায় আক্রান্ত হন তাদের পক্ষে ওই আর্থ-সামাজিক এবং পারিবারিক সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার ক্ষমতা থাকে না। চিকিৎসার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের সেই ক্ষমতাটাকে ফিরিয়ে আনা। সেই ক্ষমতা হারিয়ে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীদের কাছে আত্মহননকেই সহজ সমাধান মনে হয়।
৭. রাষ্ট্রকে জনগণ ট্যাক্স দেয় তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। বাংলাদেশ কি তাঁর সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছে? আবু মহসিন খান এবং পল্লবী মন্ডলদের কাহিনী পড়ে এ কথা বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হয় যে সরকার আসলেই তার নাগরিকদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করছে!
Editor: Rumana Jaman Shachi
Raipura House (2nd Floor), 5/A, Outer Circular Road
West Malibag, Dhaka-1217
Communication
E-mail: vinnabarta@gmail.com
Phone:+8802222220051