1. [email protected] : admin : jashim sarkar
  2. [email protected] : admin_naim :
  3. [email protected] : admin_pial :
  4. [email protected] : admin : admin
  5. [email protected] : Rumana Jaman : Rumana Jaman
  6. [email protected] : Saidul Islam : Saidul Islam
ভালবাসার অভাবে ভয়ানক অভিমান |ভিন্নবার্তা

ভালবাসার অভাবে ভয়ানক অভিমান

vinnabarta.com
  • প্রকাশ : রবিবার, ২ মে, ২০২১, ০১:২৭ অপরাহ্ন

জেসমিন দীপা

সিমুর মনে গভীর জেদ চেপে বসে আছে দীর্ঘদিন ধরে৷
অবহেলায়! কেউ কি এতোটা কৃপন হতে পারে! সিমুর বুকের ধুকপুক গুলো শুনলো না, একটুও যতন করলো না৷ এমনও হয় নাকি? ভালবাসার পৃথিবীটা বুঝি এমন?
সিমুর জানা নেই৷
ভালবাসা এমন অবাধ ভাবে কখনো আসেনি৷ এসেছিল অনেক বছর আগে অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়৷ সিমুও ভালোবেসেছিল, বিয়ের পর স্বামীকে৷ দেড়টা বছর কাটতে না কাটতে প্রেমিক স্বামী পুরাদস্তুর গৃহস্বামী হয়ে গেল৷ কখন সিমুকে বোঝেনি একটু আলাদা করে, একটু স্নেহের ছোঁয়ায়, আন্তরিকতায়৷ নৈকট্য লাভের অনেক চেষ্টা করেছে সিমু৷

স্বামীর ভালোবাসার পাওয়ার টিপস আসতো বিভিন্ন ঘরোয়া ম্যাগাজিন গুলোতে ৷ সিমু খুব আগ্রহ করে পড়তো৷ প্রতিদিন স্বামীকে চিঠি লিখতো৷ ছোট ছোট চিরকুটে “ভালবাসি” কথাটি লিখে ওয়ালেটে, শার্টের বুক পকেটে, প্যান্টের পকেটে কিম্বা পানি খাওয়ার মগের নীচে, হাত ধোঁয়ার বেসিনে সাবানের নীচে,
যেন রাসেলের যে কোন কাজেই নজরে আসে৷

খেতে বসে ডাইনিং টেবিলের নীচে অকারনে পায়ে পা দিয়ে টোকা দেয়া,
এই দেখো তো আমার জ্বর নাকি ?
বিভিন্ন উসিলায় একটু ছোঁয়ার আশা!

মার্কেটে যেয়ে হাত ধরে শপিং করা, খুব পারসোনাল কিছু কেনার সময় দুষ্টুমি হাসি একঘেয়ে সংসারকে প্রাণময় করে, কিন্তু এতো চেষ্টাতেও সিমু তা করতে পারেনি ৷

অনেক বছর পেড়িয়ে এসে বয়স যখন চল্লিশ ছুঁই ছুঁই সিমু আরেকবার প্রেমে পড়লো৷ ফাহাদকে কেন এতো ভালো লাগে , কেন এতো ভাল লাগে? তবে কি মনের গহীনে জমে থাকা অপ্রাপ্তি গুলো প্রাপ্তি খুঁজে মরে এই অবেলায়! কখনো কখনো ফাহাদ উপেক্ষা করলেও অবহেলা করেনি আবার অধিকারও দেয়নি৷

যেদিন থেকে ফাহাদকে ভাল লাগতে শুরু করল ভাললাগার উর্ধ্ব গতি থামাতে পাড়েনি সিমু, নিজ আবেগে বাড়তেই থেকেছে৷ বাড়তে বাড়তে জেদ এ রুপ নিয়েছে৷ ভালবাসাহীন হয়ে ঝড়ে পড়বে সিমু? , ফাহাদের কি একটুও দুঃখ হবে না?
যদি না হয় তবে সিমু বুঝে নিবে ফাহাদ কোনদিনও তাকে ভালবাসেনি৷ সিমু শুধু একা পুড়েছে হৃদয়৷
কতবার কতদিনই তো সিমু জানিয়েছে মনে খবর,

নিজেকে প্রকাশ করেছে খোলা বইয়ের মতো, কোন রঙটা, কোন সাজটা কোন কাজটা ফাহাদ এর পছন্দ সিমু সেভাবেই গড়তে চেষ্টা করেছে নিজেকে৷ নীল টিপ বা চোখ ভরে কাজল হাত ভরে কাঁচের চুড়ি… ফাহাদের ছাচে গড়েছে নিজেকে ৷ বুক ভরে সুখ টুকু নিজের মতো করে একাকী অনুভব করেছে৷

মনে মনে চেয়েছে ফাহাদ বুঝি হঠাৎ করে দুই ডজন কাঁচের চুড়ি কিনে নিজ হাতে পড়িয়ে দিবে কোন বিশেষ দিনে, সেই দিন কোনদিন আসেনি৷ একটা নারী হওয়ার সবটুকু শালীনতা রক্ষা করে সিমু কতদিন চিৎকার করে কেঁদেছে ৷ না পাওয়ার যন্ত্রনায় নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করেছে ব্লেডের আঘাতে আঘাতে৷ ফাহাদ বোঝেনি, রাসেলও বোঝেনি৷ নিষ্ঠুর পৃথিবীর কেউ বোঝেনি৷ না বুঝার বোঝা গুলো কাঁটা হয়ে বিদ্ধ করে অহর্নিশ৷

সকালে খুব সুন্দর করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিজেকে সাজায় সিমু৷ দুই মাস ঘরে থেকে থেকে শরীর জ্যাম হয়ে গেছে৷ গিটে গিটে ব্যথা, মেজমেজে ভাব … ভালো লাগে না৷ লক ডাউনের আগে কিনে রাখা নতুন শাড়িটা হাতে নেয় সিমু৷

লাল কালো কম্বিনেশনের চমৎকার সুন্দর শাড়ি৷ শাড়ি পড়ে মেচিং চুড়ি, ছোট্ট একটা কালো টিপ আর কাজল৷ লিপস্টিক পছন্দ নয় ফাহাদের, হালকা চলতে পারে৷

হ্যান্ডব্যাগটা কতদিন ব্যবহার হয় না৷ পরিস্কার করে ঝেরে মুছে গুছিয়ে নেয়৷ টাকা কতটা আছে চেক করে৷
দীর্ঘ দিন পর আকাশের নীচে সিমু৷ সব কিছু কেমন অচেনা অচেনা লাগে, পথের ধারে চেনা জানা দোকান পাট গুলো কেমন অচেনা৷ একটা রিক্সাকে ঠিকানা বলতেই রাজী হলো, দরদাম কিছু করে না৷ আজ সিমুর যা ইচ্ছে করবে, হিসেব করে বাঁচা নয়৷ মন খুলে বাঁচা৷ বাঁধাহীনভাবে৷
ধানমণ্ডি লেকের পাশে রিক্সা থামলো৷ অতসী পাঁচ’শ টাকার একটা নোট দেয়৷
ভাংতি নাই আপা,
দিতে হবে না, আজ বাসায় পরিবারের সাথে ভাল কিছু কিনে খাবেন ভাইয়া৷ রিক্সা চালকদের জন্য সিমুর খুব আবেগ কাজ করে৷ কত কষ্ট করে গন্তব্যে পৌছে দেয়! রিক্সায় উঠলেই সিমু গল্প শুরু করে, বাড়ি কোথায়, সংসারে কে কে আছে৷
ওনারা খুশী হন৷ আবার উল্টাটাও ঘটেছে সিমুর সাথে৷ সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল এক রিক্সাচালক৷ সেই গল্প না হয়
আরেকদিন শুনবো৷
ব্যারিকেট দেওয়া প্রবেশ মুখে৷ কিছু টহল পুলিশ ছাড়া লেকের চারপাশ শুনশান৷ এলাকার দুই চারজন পথচারী ছাড়া কেউ নেই৷ ঢোকার পথেই পুলিশ বাঁধা দিলো৷ সিমু অনুনয় করলো , হাত বাড়িয়ে দেখালো…
আমি ওখানে কিছুক্ষণ বসব, চলে আসবো৷ কোন অনিয়ম করবো না ভাইয়া৷ দেখুন আমার গ্লাফস আছে মাস্ক আছে৷ যেতে দিন প্লিজ, পুলিশের মনে বোধ হয় সহানুভূতি হলো,
—দেরী করবেন না ম্যাডাম,
— একদম নয় ভাইয়া, জাস্ট ত্রিশ মিনিট৷
সিমু যেন নতুন করে প্রাণ পেলো৷ আহা! বেঁচে থাকা এতো সুন্দর!
লেকের পানি সবুজ হয়ে আছে৷ ঢেউ হীন , শ্যাওলা জমেছে৷ ৩২ নম্বর ডানে রেখে লোহার ব্রীজটা পাড় হয়ে হাঁটতে থাকে সিমু৷ মানুষহীন প্রকৃতি নিজের আসল চেহারা মেলে ধরেছে৷ গাছের শাখায় শাখায় কত রকমের ফুল, হিজল কামিনী পানিতে শাপলা…
ক্যাফেটা বন্ধ, সিমেন্টের ব্রেঞ্চটায় হয়ত অনেকদিন কোন যুগল বসে না হলুদ রাধাচূরা ছড়িয়ে আছে৷ সিমু কয়েকটা কুড়িয়ে বসার জায়গা করে নেয়৷ মাথার উপর টুপটাপ পড়ছে ঝরে রাধাচূরা৷

আজ আর ফুল ওয়ালি শিশুগুলো নেই, হিজরা নেই বাদাম ওয়ালা নেই৷ শুধু নিরিবিচ্ছিন্ন প্রকৃতির অবাধ আনাগোনা, পাখির কলতান৷ সিমু সেদিনের প্রতিটি কথা মনে করার চেষ্টা করে, স্মৃতি গুলো আজও অমলিন৷ কিছুই ভোলেনি সিমু, আঙ্গুলে আঙ্গুলে ধরা পায়ে পায়ে চলা, কাঠবিড়ালির একছুটে বটগাছে লুকিয়ে যাওয়া ৷
ফাহাদ জানতে চেয়েছিল, আজ কত তারিখ?
সিমু বলে৷
আগামী বছর এই দিনে মনে করিয়ে দিও , একটি কথা বলবো৷
সেই কথাটি শোনার জন্যেই আজ সিমু এখানে৷ ৩৬৫ দিন ৩৬৫ রাত অপেক্ষা করেছে সিমু এই দিনটির জন্যে৷ কত চোখের পানি ঝড়েছে অভিমানে… সেই খবর কেউ জানে না, ৩৬৫ দিনে কত ঘন্টা কত মিনিট কত সেকেন্ড, কত প্রহর কেটেছে সেই হিসাব কেউ জানে না৷ আজ সিমু সেই হিসাবটুকু চাইতেই এখানে এসেছে সকল নিয়ম ভেঙ্গে৷ অমীমাংসিত কিছু গল্প সারা জীবনটাকে তাড়া করে ফেরে, সিমু জানতে চায়৷
সিমু কান পাতে প্রকৃতির ফিসফিসানিতে, ওমা! কিভাবে সম্ভব, আকাশ বাতাস, গাছের ডালে ডালে, পাতায় পাতায়, শাখায় শাখায় ফুলের গুচ্ছে, উড়ন্ত পাখির দল একই কথা বলছে —
সিমু … সিমু … আমরা তোমাকে ভালবাসি, এই দূর্দিনে কেউ আমাদের কাছে আসে না, কতদিন আমরা মনুষ্যহীন, আজ তুমি এসেছো , আমাদের সব ভালবাসা তোমার জন্যে৷
সিমু আনন্দে দিশেহারা সে কি ঠিক শুনছে! তবে কি ফাহাদ সব কথা ওদের কাছে জমা রেখে গেছে! ফাহাদ কি তবে জানতো যে সিমু আসবে? না এসে থাকতে পারবে না৷ তাই যে কথা নিজে বলতে পারে না তা বলে গেছে প্রকৃতির কাছে!
ধ্বনিত হচ্ছে ভালবাসি ভালবাসি ভালবাসি…!

সিমু রাধাচূরার গাছটি দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে কাঁদে, সেই কান্নায় বাতাস ভারী হয়৷ এ কেমন অন্তর স্থল কেন এতো অসহায় আজ!
সিমু হাত নাড়িয়ে বলে—
ত্রিশ মিনিট শেষ…
ভাল থেকো ফুল
মিষ্টি বকুল, ভাল থেকো,
বেঁচে যদি থাকি, আবার আসবো…
রাসেল স্কয়ার পান্থপথ বাংলামটর হয়ে অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে বাসায় ফিরে সিমু৷ ক্লান্ত পরিশান্ত ভীষণ৷ পথ চলার অভ্যেস নেই সিমুর, একদমই পারে না কারোর সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে৷ বাসায় ফিরে অনেক প্রশ্নবান নিরবে সহ্য করে নেয় সিমু ,এটাই স্বাভাবিক৷
রাতের বেলা শরীরের ব্যথা বাড়লো, প্যারাসিটামল খেয়ে কমানোর চেষ্টা করলো৷
প্রতিদিন নরমালই সিমুকে অনেক গুলো অষুধ খেতে হয়৷ একদিনও বাদ দেয়া সম্ভব নয়৷ শরীর খারাপ করে৷
করোনা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হচ্ছে না৷ মানুষের জীবনের সব নিয়মগুলো অনিয়ম হয়ে গেছে৷ সিমুর মতোই আরো অনেকের দিন রাতের রুটিন বদলে গেছে৷ কিবা দিন আর কিবা রাত৷ সব একই৷
শরীর ভাল লাগে না সিমুর৷ জ্বর আসছে থেকে থেকে৷ সারাক্ষণ খুকখুক করে কাশি হচ্ছে৷ রাতে ফ্যানের বাতাসে ঠান্ডা লেগে এমন হয়েছে৷ তা ছাড়া সিমু ঠাণ্ডা পানি খেতে খুব ভালবাসে৷ ডাইরেক্ট ফ্রিজের পানি৷ ঠান্ডা পানির সাথে বকাটা ফ্রি খায় সিমু৷
জ্বর আসছে প্রতিদিন৷ রাসেল চেষ্টা করে বিষয়টা গোপন রাখতে৷ যদি কেউ জানে বিল্ডিং এ থাকা বিপদ হয়ে যাবে৷ হট লাইনে ফোন দিয়ে মোটামুটি ধারনা হলো করোনা ইভেক্ট করেছে সিমুকে৷ সব সিনট্রমস তাই বলে৷ওরা পরামর্শ দিলো পেসেন্টের জন্যে আইসোলেশনের ব্যবস্থা বাসাতেই করেন৷ বেশী প্রয়োজন হলে আমরা হসপিটালে আনবো৷
বাসার মানুষ গুলোর কষ্ট বেড়েছে৷ সংসার সামলাচ্ছে, দূর থেকে খাবার দিচ্ছে রুমে, দরজার সীমায় দাড়িয়ে সবাই কষ্ট পাচ্ছে! সিমু একা ওয়াস রুমে যায়, অষুধ খায়৷ বই পড়ে সারাদিন শুয়ে শুয়ে৷ জানালা দিয়ে দিন রাত্রি হওয়া দেখে৷ ভোরের পাখির কলতান সন্ধ্যায় আঁধার নেমে আসে চোখের সামনে৷ এতোদিন এতো গভীর ভাবে প্রতি মূহুর্ত গুলোকে উপলব্ধি করার অবসর মেলেনি , এখন অখণ্ড অবসর! সময় কাটেনা৷

যদি হসপিটালে যাই বাসার মানুষ গুলোর দূর্ভোগ বাড়বে৷ দৌড় ঝাপ , টাকা পয়সার শ্রাদ্ধ!
যে মৃত্যু কাওকে কাছে আসতে দেয়না, কাওকে ছুঁতে দেয়না, ধরতে দেয় না, সেই তো কাম্য
সিমুর৷ নিয়তি সব সময় একা ভোগ করতে হয়, সবাই কেন কষ্ট পাবে!

যে মৃত্যুর পর কেউ ছোঁবে না , স্বজন কাছে থাকবে না, দয়া দরুদ পড়বে না পাশে বসে, দাফন কাফন করবে না , স্বজনের কাঁধ পাবেনা তেমন মৃত্যুও চায় না সিমু৷

হাঁটতে হাঁটতে ঠিক কত দূর এলো সিমু বুঝতে পারছে না৷ জায়গাটা অচেনা, এলোমেলো পা পরছে, শরীরের শক্তি শেষ হয়ে আসছে৷
আরো কত পথ হাঁটতে হবে অজানায় যেতে!
আকাশ ধীরে ধীরে রক্তিম হচ্ছে , লাল আভা ছড়িয়ে পরছে …..
আহা !কি সুন্দর দুনিয়াটা… মায়াময়!
ঝর্ণা ছুটে চলে এঁকেবেঁকে
পৃথিবীর পথে কত ছবি একে
নদীরও কলতানে
সাগরের গর্জনে।
ঢেউয়ে ঢেউয়ে দেয় পাল্লা।
কিছুক্ষণ পরেই সূর্য উঠে যাবে
আরেকটি নতুন দিনের সূর্য৷ শুধু সিমু দেখলো না৷

লেখক: বাংলাদেশ তরুণ লেখক পরিষদ, সদস্য বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র

আরো পড়ুন

মাসিক আর্কাইভ

© All rights reserved © 2021 vinnabarta.com
Customized By Design Host BD