শিরোনাম

দক্ষিণ এশিয়ার সূচকে বাংলাদেশের নারীরা এগিয়েছে

জোবাইদা নাসরীন

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও জেনারেশন ইক্যুয়ালিটি সমতা অনুসরণে ইউএন উইমেনের নতুন বহুমাত্রিক প্রচারণা রয়েছে। ‘ইউএন উইমেন ২০২০ থিম’-এ বলা হয়, ‘আমি প্রজন্মের সাম্য :নারীদের অধিকার আদায় করছি’। গতবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘ব্যালান্স ফর বেটার’ অর্থাৎ ‘ভালোর জন্য সমতা’। এর এক ধাপ এগিয়ে এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য সমতা’ সবাইকে মনে করিয়ে দেয়, লিঙ্গ সমতা বিশ্ব তৈরিতে সহায়তা করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। এটিকে সামনে রেখেই এ বছরের নারী দিবসের হ্যাশট্যাগ ‘ইচ ফর ইক্যুয়াল’। বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের নারীরা এগিয়েছে, জাতীয় অর্থনীতির জন্য যা ইতিবাচক। বাংলাদেশ শীর্ষ কর্মপদে নারীর ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান করেছে অনেকখানিই। তবে এই অগ্রগতি প্রশ্নও রেখেছে অনেক। প্রতি মুহূর্তেই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, দেশে প্রায় তিরিশ বছর ধরে (শুধু দুই বছর তত্ত্বাধায়ক সরকারের আমল) বাংলাদেশ নামক দেশটি নারী প্রধানমন্ত্রীর শাসনে আছে। তাহলে সেখানে প্রতিদিনই কেন ধর্ষণের খবর পত্রিকায় ভর করে? সেখানে নারীর প্রতি এত সহিংসতা হয় এবং সেটির বিচার প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ হয়? সেখানে কেন নারীর নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে ওঠে?

এই বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ তোলার আগেই খোলাসা করতে হবে যে, নারী কোনো সমগোত্রীয় ক্যাটাগরি নয়। বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলিম নারীর অবস্থা দিয়ে কখনও অমুসলিম নারী কিংবা আদিবাসী নারী কিংবা দলিত নারীর অবস্থা বিবেচনা করা যাবে না। কিংবা সব বাঙালি নারীর অবস্থা একই দাঁড়িপাল্লায় ফেলা যাবে না। সেখানেও রয়েছে শ্রেণি, পেশা, শিক্ষা কিংবা বর্ণসহ নানা ধরনের অসমতার পাটাতন। তাই একজন নারী প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই সে দেশের নারীর প্রতিনিধি হয়ে ওঠে না।

নারী এগিয়েছে… মিডিয়া বা আমরা সেই ব্যক্তিক নারীর সফলতা উদযাপন করি, কিন্তু সেই ব্যক্তিক নারীর সফলতা কীভাবে নারী নিপীড়ন রোধ কিংবা পলিসি নির্ধারণে কী ভূমিকা রাখছে, সেই বিষয়ে আলোকপাত করি না, যার ফলে সেই উদযাপন হয়ে পড়ে একেবারেই অনৈতিহাসিক এবং ঘটনাকেন্দ্রিক। অন্যদিকে যদি আমরা নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধের ধরন বিশ্নেষণ করি, তাহলে দেখি যে, নারী নিপীড়ন এখনও আমাদের কাছে অনেকটাই নারীর ইস্যু, মানবতার বিরুদ্ধে ইস্যু নয়। আমাদের প্রতিবাদী নড়াচড়াও অনেকটাই ‘ইভেন্ট’কেন্দ্রিক। যার কারণে এর রেশ থাকে দুই কিংবা তিন দিন। কারণ আমরা এখনও এই লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে শিখি না। আমরা এখন ছোটবেলা থেকেই একজন মেয়ে শিশুকে ‘ভালো স্পর্শ’, ‘খারাপ স্পর্শ’ শেখাচ্ছি, যৌন হয়রানি মোকাবিলায় জুডো-কারাতে শেখাচ্ছি। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার সবাই নারীকে কেন্দ্র করেই পদক্ষেপ নিচ্ছে, কিন্তু এর পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি আঁচড় পড়ছে না। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে যে, পুরুষ মানেই পুরুষতান্ত্রিক নয়, আবার নারীরাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুতান্ত্রিকতার মধ্যেই বেড়ে ওঠে। কারণ সমাজ, রাষ্ট্র যে পুরুষতান্ত্রিক।

এখন প্রশ্ন হলো সবার জন্য সমতা নিশ্চিত আমরা কীভাবে করব? বিশেষ করে যে বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে এত ধরনের শ্রেণি বিন্যাস আছে? এত ধরনের অসমতার উপকরণ আছে? আরও বিশেষ করে বলতে গেলে যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই নারীর জন্য অর্থনৈতিক মুক্তিও তার নিজস্ব মুক্তি আনেনি, সেখানে এই সমতা আসলে কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে?

এই মুক্তির পথে একটি যুক্তি আছে, আর সেটি হলো নারীর সঙ্গে পুরুষকেও পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। এই বাধা অতিক্রম হলেই হয়তো ঘুচবে আরও শ্রেণি বৈষম্যসহ অনেক ধরনের অসমতার গর্তগুলো। আমি বিশ্বাস করি, পুরুষতন্ত্রের বিপক্ষে পুরুষের দৃঢ় এবং নৈতিক অবস্থান নারীর প্রতি বৈষম্য এবং নিপীড়নকে বন্ধ করার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। নিশ্চিতভাবেই খুলে যাবে সবার জন্য সমতার দরজাটি। মানুষের প্রতি মানুষের মমতার জায়গাটিই সবচেয়ে জোরালো। ‘এখনও আসেনি মমতার দিন, সমতা আসে না আজও’।

লেখক : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
আরো পড়ুুন