শিরোনাম

তাজরিন ট্র্যাজেডি
আহতদের অনিশ্চিত কর্মজীবনের ৭ বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাত বছর পূর্বে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আজকের দিনে সাভারে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরিন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে প্রান হারায় ১১৩জন শ্রমিক। অগ্নিদগ্ধ ও ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন আরো প্রায় দেড় শতাধিক। তবে তাজরিন ট্র্যাজেডির এত দিন পেরিয়ে গেলেও যন্ত্রণা যেন পিছু ছাড়ছে না আহত শ্রমিকদের। শারিরীক অক্ষমতা আর মানুষিক যন্ত্রণা নিয়ে এখনও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন তারা।

সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টায় গত বছর জরিনা, সবিতরা কয়েক জন মিলে ছোট কারখানা গড়লেও পুুঁজির অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে সে চেষ্টাও। সাময়িক সাহায্য পেলেও পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসিত হতে না পেরে তাদের অনেকের পরিবারে নেমে এসেছে অমানিশার ঘোর অন্ধকার।

নিশ্চিন্তপুর এলাকায় গত সাত বছর ধরে বিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাসরত তাজরিনের আহত এমন বেশ কয়েক শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের এমন জীবনযুদ্ধের কাহিনী। শারিরীক, মানুষিক সাথে অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে তারা বেছে নিয়েছেন জীবিকা নির্বাহের নানা পথ। কেউ বা দিন হাজিরায় বিলি করছেন লিফলেট, কেউ বিক্রি করছেন পিঠা, আবার কেউ অন্যের দোকানে কাজ করে পার করছেন অনিশ্চিত কর্মজীবন।

তাজরিন অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতায় তিন তলা থেকে লাফিয়ে বেঁচে ফেরা এমনি এক শ্রমিক সবিতা রানী। তাজরিন গার্মেন্টের পাশেই একটি শ্রমিক কলোনিতে পরিবার নিয়ে থাকেন সবিতা। আহত হওয়ার পর সাময়িক সাহায্য পেলেও যে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল তা পাননি বলে অভিযোগ তার।

এমতাবস্থায় গত বছর নিজেদের জমানো পুঁজি দিয়ে তারা কয়েকজন মিলে একটি ছোট কারখানা গড়েছিলেন। কিন্তু পুঁজির অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে সেটাও।

সবিতা রানী বলেন, ‘সবাই তাজরিনের ঘটনা ভুলতে পারলেও আমরা যারা আহত আছি তারা ওই দিনটার কথা ভুলতে পারবো না। এঘটনার পর থেকে শারিরীক ও মানুষিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। অনেক কারখানায় ঘুরেও কোন কাজ না পেয়ে নিজে কিছু করার চেষ্টা করি। গত বছর আমরা আহত শ্রমিকদের কয় জন মিলে একটি ছোট্ট কারখানা শুরু করলেও পুঁজির অভাবে সেটা সম্ভব হয়নি। এরপর অনেক কষ্টে একটা সেলাই মেশিন কিনে বাসায় টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করছি। পাশাপাশি একটি সংস্থার প্রচারণার জন্য বিভিন্ন জায়গায় লিফলেট বিতরণ করে দিন ৪’শ টাকা মজুরি পাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর সরকার তাদের যে সাহায্য করেছে তা চিকিৎসার পেছনেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা সাহায্য চাই না, ক্ষতিপূরণ চাই। তাই আমরা ভালো ভাবে সুস্থ ভাবে চলতে পারি সরকার ও বিজিএমইএ যেন তাদের জন্য এধরণের ব্যবস্থা করে।’

সড়কের পাশে পিঠা বিক্রি করছেন তাজরিনের আরেক শ্রমিক শিল্পী বেগম। ছবি: শিরোনাম বিডি

এখনও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় ছোট মেয়ে ও পাগল বোনকে নিয়ে থাকেন তাজরিনের আহত আরেক শ্রমিক পটুয়াখালী জেলার স্বামীহারা শিল্পী বেগম।

তাজরিনের অপারেটর শিল্পী বেগমের অভিযোগ, ‘ঘটনার বিভৎসতায় ওই দিন তিন তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে বেঁচেছিলেন। কিন্তু এরপর দেশের বাড়িতে চলে যাওয়ায় সরকারি সাহায্যের তালিকায় তার নাম ওঠেনি। এ কারণে কোন প্রকার অনুদান পাননি। তবে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তাজরিনের শ্রমিক হিসেবে কিছুটা চিকিৎসা সেবা পেয়েছেন। তারপরও কেন সরকারি তালিকায় তার নাম নেই।’

শিল্পী আরো বলেন, ‘তাজরিনের ঘটনার পর শত চেষ্টা করেও কোন কারখানায় চাকরি নিতে পারেননি। অন্য কারখানায় তাজরিনের শ্রমিকের কথা শুনলেই তাড়িয়ে দেয় কতৃপক্ষ। কোন উপায়ন্তু না পেয়ে কখনও পিঠা বিক্রি করি, আবার কখনও টেইলার্সের কাজ করে পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন পার করছি।’

‘তাই পরিত্যক্ত এই কারখানাটা সরকার খুললে, তাহলে সেখানে চাকরি করতে পারতাম। তার মত আহত শ্রমিকরা সেখানে কাজ করতে পারতো। এজন্য সরকার ও বিজিএমইএ’র সুদৃষ্টি চাই।’

তাজরিনের চার তলার সুইং সুপারভাইজর সোলায়মান বলেন, ‘চতুর্থ তলা থেকে লাফ দেওয়ার কারণে আমার ডান পা’র আট জায়গায় ভেঙ্গে যায়। মাজায়ও ব্যথা পাই। পরে পায়ে রড ঢুকানো অবস্থায় অনেকদিন চিকিৎসাধীন ছিলাম। এরপর সুস্থ্য হলেও পা দুই ইঞ্চি ছোট থাকায় ভারী কাজ করতে পারি না। তাই এখনও কর্মহীন অবস্থায় বড় ভাইয়ের বোঝা হয়ে কষ্টে দিন পার করছি।’

এব্যাপারে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, তাজরিন ট্র্যাজেডির ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা সামান্য সাহায্য ব্যতিত প্রকৃত পুনর্বাসন সুবিধা পায়নি। আর দীর্ঘ দিন ধরে কর্মহীন থাকার কারণেই তারা মানুষিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে পারিবারিক ভাবেও তারা মানুষিক অশান্তিতে রয়েছে।

এছাড়া মানুষিক সমস্যার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া। তাই তাজরিনের ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের প্রকৃত পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে তাদের এই মানুষিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা থাকতো না। এজন্য সরকার ও বিজিএমইএকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আইআই/শিরোনাম বিডি

সংবাদ সম্পর্কে আপনার মতামত দিন
আরো পড়ুুন